কাশফিয়া আঁখির শিশুতোষ গল্প “নাবিলের কুকুর”

নাবিলের কুকুর
কাশফিয়া আঁখি

পাখির কলকাকলিতে মুখর চারপাশের প্রকৃতি। সকালের রোদ সবে উঁকি দিচ্ছে পাতার ফাঁক দিয়ে। দূরে কোথাও একটা মোরগ ডেকে যাচ্ছে একটানা।
ছেলের শিয়রের কাছে এসে নাবিলের মা ডাকছে, বাবা উঠো সকাল হয়েছে, নাবিলের সারা নেই। অঘোরে ঘুমাচ্ছে সে। মা কাছে গিয়ে চুলে হাত নেড়ে দিয়ে ডাকলো, উঠো বাবা ! বিছানায় আরমোড়া ভেঙে চোখ রগরাতে রগরাতে সে বললো ,কয়টা বাজে মা ?
সাতটা বেজে এলো প্রায় ! তুমি তাড়াতাড়ি উঠে হাত মুখ ধোও না হলে আরবি পড়তে দেরি হয়ে যাবে তোমার। এক ঝটকায় বিছানা ছেড়ে দ্রুতপায়ে বাথরুমে ঢুকলো সে।
মা, টেবিলে এক গ্লাস পানি আর একটা সিদ্ধ ডিম রেখেছেন । নাবিল হাত মুখ কোন রকমে মুছে ডিম আর পানি খেয়ে ছুটতে লাগলো আরবি পড়তে। এই সকালে ঘুম থেকে উঠে আরবি পড়তে যাওয়া থেকে তার দৌড় ঝাঁপ শুরু। বিকালে এক দেড় ঘন্টা সময় শুধু সে খেলা ধুলা করে কাটায়। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা, অভিবাভকদের চ্যালেঞ্জ মুখি মানসিকতা, টিভি আর গেমসের প্রতি আসক্তি আমাদের এই বর্তমান প্রজন্মকে রোবট করে তুলছে। আগের সেই দিনের মতো গ্রামে বড় হয়ে উঠলেও গ্রামের সেই সোনালী শৈশব নেই। স্কুল ফিরে সব বন্ধুরা মিলে সারাদিন হইচই নেই। বন্ধুদের পুকুর পাড়ের আম গাছ থেকে ঝুপ ঝাপ পানিতে ঝাঁপ দেয়া নেই। দক্ষিণের বাগানে পাখির নতুন জন্ম নেয়া বাচ্চাগুলোর মুখ দেখার তাড়া নেই। বর্ষা কালে কলার ভেলায় চড়ে শাপলা শালুক তোলার আনন্দ নেই। হাঁটু পানিতে সমবয়সীরা মিলে তিনটি বাঁশের কঞ্জি আর জাল দিয়ে বানানো পেনি দিয়ে ছেঁকে ছেঁকে মাছ ধরার খুশি নেই। আজ যেন রুপকথা হয়ে গেছে দূরন্তপনা শৈশবের দিনগুলো। ফড়িং ধরা, কোন গাছে কোন ফল পাকলো সেই খোঁজ রাখা দস্যি ছেলে গুলো এখন বড় জোর মাঠে বল নিয়ে ফুটবল, ক্রিকেট খেলে।
কাবাডি এখন দাদা নানার শৈশবের খেলা এদের নয়। এই প্রজন্মের কাছে এখন সহজ সব কিছু। তাই সস্তায় কেনা বিনোদনে মগ্ন তারা। চারপাশের এতো সব প্রকৃতির রুপ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে যেন অনেকে স্বেচ্ছায়।
র্বতমান গড়পরতা সেসব মানুষ থেকে আলাদা নাবিল। পশু-পাখি, মানুষ , প্রকৃতির প্রতি অসীম মমতা নাবিলের ছোট্ট মনে। রাস্তায় কখনো কোন পঙ্গু , কানা, অসহায় ভিক্ষুক যদি তার পাশ দিয়ে সাহায্য চাইতে চাইতে যায় নাবিল নিজে ডেকে তাকে তার টিফিনের টাকাটা দিয়ে দেয়।
নিজের বাড়ির আঙ্গিনায় অনেক ফুল ফলের গাছ লাগিয়েছে নিজেই। প্রতিদিন বিকালে সেগুলেতে পানি দেয় । আরবি পড়া শেষ করে বাড়ি ফিরে স্কুলের পড়াটা আরো একবার ঝালাই করে নিতে তার ভুল হয়না। তারপর গোসল সেরে নাস্তা খেয়ে স্কুলে যাবার জন্য রেডি হয়।
নাবিলের ছোট বোন তিথি। বয়স ৪বছর। ভাইয়ের দেখাদেখি সন্ধে হলেই সে বই খাতা নিয়ে পড়তে বসে । মা তাকে পড়ালে সে পড়বে না। নাবিলের কাছেই সে পড়বে। নাবিল তাকে ধরে ধরে বর্ণমালা শিখায় ভাইয়ের সাথে পড়তে পাড়ার আনন্দে খলখলিয়ে হাসে ছোট্ট তিথি।
স্কুল ছুটি হয় দুপুর দুইটাই। নাবিল বাড়ি এলেই ভাই বোন আর মা মিলে এক সাথে দুপুরের খাবার খায়। বাবা সকালে অফিসে যায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা প্রায়।
আজকে প্রচন্ড রোদ উঠছে। পিচঢালা রাস্তা যেন তেতে উঠেছে। রোদের তাপে নরম হয়ে গেছে পথের উপর দেয়া পিচের প্রলেপ । গাছের পাতা গুলোও নেতিয়ে পড়েছে। রাস্তার আশে পাশে একটা কাক পক্ষী ও নেই। অ¯^াভাবিক এ তাপদহন সইতে না পেরে লোকারন্য ছেড়ে ওরা কোন বাদাড়ে গা লুকিয়েছে একটু শীতলতার আশায়। স্কুল ছুটির পর নাবিল হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির প্রায় গাছে গাব গাছের তলায় আসতেই শুনতে পেলো কুই, কুই, কুন, কুন শব্দ।
এদিক ওদিক খুঁজতে লাগলো নাবিল, কোথায় থেকে আসে শব্দটি। চার পাশে ভালো করে তাকালো । গাব গাছটির আশে পাশে সে ছাড়া আর একটা প্রাণী ও নেই। অনেকের কাছে গল্প শুনেছে সে। গাব গাছটাতে নাকী ভূত থাকে। এই মর্হূতে সে কথা মনে হয়ে ভয়ে গা তার ছমছম করতে লাগলো।
তবুও তার উৎসুক মন খুঁজতে লাগলো, শব্দটি আসছে কোথায় থেকে ?
গাব গাছটির নিচটা ভালো মতো দেখলো নাবিল। উপরে ও তাকালো। না, কিছু নেই তো! তাহলে শব্দ আসছে কোথায় থেকে? কান পেতে শব্দটা ভালো করে শুনলো। সেদিকে এগিয়ে গেলো। হঠাৎ চোখ পড়লো নাবিলের, গাব গাছের গোড়ায় একটা ফোঁকড় আছে।
সেখান থেকে শব্দ আসছে। মাটিতে উপুর হয়ে সে দেখার চেষ্টা করলো ভেতরে কিছু আছে কী না। গর্তটার ভেতরে অন্ধকার । শুধু দুটি চোখ অন্ধকারে জ্বল জ্বল করতে দেখা যাচ্ছে । প্রথমে সে চমকে গেলেও পরে বুঝতে পারে র্গতের ভেতরে কিছু একটা আছে। আর শব্দটা সেখান থেকেই আসছে।
ভালো মতো তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো, কি হতে পারে এটা!
একটা ছোট্ট লাঠি খুঁজতে লাগলো সে এদিক সেদিক তাকিয়ে। একটু দূরে মিলে গেলে পাটকাঠির অধেক অংশ। সেটা দিয়ে গর্তে খোঁচা দিতে কেঁদে উঠলো বাচ্চাটি আবারো!
আরে..এটা তো কুকুরের বাচ্চার কান্নার শব্দ। উহ্..কি ভয়টাই না পেয়ে ছিলাম আমি।
এনে মনে একা একাই হাসলো নাবিল।
এবার সাহস করে গর্তে হাত ঢুকিয়ে বাচ্চাটাকে বের করে আনলো । আর্তনাদ করে উঠলো বাচ্চাটি ।
আহারে ….বাচ্চাটার পা কেটে গেছে অনেকখানী ব্যাথায় বাচ্চাটা জবু থবু হয়ে আছে।
বাচ্চাটা কোলে নিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলো। সাদা আর কালো গায়ের রঙ বাচ্চাটির, তবে গায়ের লোম গুলো অনেক বড় বড়। কালো চোখে দুটো ভরা মায়া যেন নাবিলের চোখে ভালোবাসার ঝলকানীতে ভরিয়ে দিল।
নাবিল বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে বাড়ি ফিরছে আর বাচ্চাটি পরম র্নিভরতায় চোখ বন্ধ করে আছে।
ছেলের হাতে কুকুরের বাচ্চা দেখে এক প্রকার চেঁচিয়ে উঠলো মা। আরে, এটাকে কোথায় পেলে? ইশ! কোলে করে এনেছো একেবারে ! মা, বাচ্চাটা অসুস্থ দেখো, ওর পা কেটে গেছে।
মা খুব ভালো করেই জানে , তার ছেলেটি অকৃত্রিম ভালোবাসা সব কিছুর প্রতি।
তিথিকে ডাকলো নাবিল। বাচ্চাটা দেখে তিথি খুশিতে লাফাতে লাগলো। বাচ্চাটিকে নামিয়ে কাধের ব্যাগটা টেবিলে রেখে ভাই বোন মিলে ব্যস্ত হয়ে উঠলো বাচ্চা কুকুরটির যত্ন আত্তিতে। পায়েরক্ষততে মলম লাগিয়ে ভালো মতো ব্যান্ডেজ করে বাচ্চা কুকুরটিকে ফলের কাটুনের বিছানা করে বিশ্রাম করতে দিল। এতোক্ষনে বাচ্চাটিকে খাবার দেবার কথা যেন ভুলে গিয়ে ছিল তারা।
কুকুরের বাচ্চাটাকে খেতে দিতে হবে। নাবিল বললো, যা তো তিথি, মায়ের কাছ থেকে বাচ্চাটির খাবার জন্য দুধ নিয়ে আয়। একটা পুরনো বাটি ধুয়ে তাকে দুধ খাওয়ানোর পাত্র বানানো হলো।
তিথি দুধ নিয়ে এলে ভাই বোনে-মিলে বাচ্চাটির দুধ খাওয়া দেখতে লাগলো।
তিথি বললো, ভাইয়া ওর নাম কি?
নাবিল বললো, আমি তো ওর নাম জানিনারে। এক কাজ কর, তুই ই একটা নাম ঠিক করে দে ওর।
আমি কি নাম দেবো। আমি তো ভালো নাম জানিনা।ঠিক আছে আমি মাকে বলবো ওর একটা সুন্দর দেখে নাম ঠিক করে দিতে।
আচ্ছা, এবার যা মাকে টেবিলে খাবার দিতে বলে তুই সাবান দিয়ে ভালো করে দু’হাত ধুয়ে আয়। আমি জলদি করে গোসল সেরে আসি।
ঠিক আছে যাও তুমি তাড়াতাড়ি।

শরৎ বিদায় নিয়েছে। হেমন্তের ছোঁয়া লেগেছে মাঠে ঘাটে। ভোরের দিকে সবুজ ঘাসের জমা শিশির বিন্দু জানান দেয় অচিরেই শীত আসছে। রাতে শেষ প্রহরে হালকা কুয়াশাও পড়তে শুরু করেছে। গ্রামের চারদিকে একটা মৌ মৌ আবেশ। পাকা ফসলের ঘ্রান, নতুন চালের ঘ্রাণ, পিঠা পায়েসের ঘ্রাণ মানেই হেমন্ত।
নাবিলের সেই কুকুরটির পায়ের ক্ষত ভালো হয়েগেছে। এখন সে নাবিলের পিছন পিছন লেজ নাড়িয়ে দিব্রি দৌঁড়ায়।
মা ওর নাম দিয়েছে লাইকা। এখন সবাই কুকুরটিকে লাইকা বলে ডাকে। লাইকা হলো মাহাকাশ যাত্রার প্রথম প্রাণী, একটি কুকুরের নাম। লাইকা ডাকলেই দৌড়ে ছুটে আসে কুকুরটি। সামনে বসে লেজ নাড়াতে থাকে সমানে। যতবার ডাকবে লাইকা……. ততবার সে মুখের দিকে মায়া মায়া চোখ করে তাকিয়ে কান নাড়বে। বার বার ডাকলে বার বার কান নেড়ে সায় দেয় লাইকা।
স্কুল থেকে এলে লাইকা কতক্ষন গা ঘেঁষবে নাবিলের পায়ে। যেন নাবিলের স্পর্শে ওর পরম সুখ খুঁজে পায়। প্রতিদিন সকালে লাইকাকে খাবার খেতে দিয়ে তবেই নাবিল খাবার খায়।
নাবিল ক্লাস ফোরে পড়ে। পড়া শুনার প্রতি ব্যস্ততা তার বাড়তে থাকে। বিকালে টিউশন শেষ
করে নাবিল লাইকাকে নিয়ে মাঠে যায়। নাবিল বন্ধুদের সাথে ক্রিকেট খেলে আর লাইকা একপাশে বসে থাকে।
সন্ধ্যায় লাইকা আর নাবিল একসাথে বাড়ি ফিরে। প্রতি শুক্রবার লাইককে শ্যাম্পু করিয়ে গোসল করিয়ে বেশ কিছুসময় রোদে শুইয়ে রাখে নাবিল।
তারপর ব্রাশ দিয়ে গা আঁচড়ে দেয়। মা বললো, নাবিল এখন শীতকাল চলে আসছে লাইককে গোসল করাতে হবেনা। মাঝে মাঝে শ্যাম্পুর পানিতে গা মুছে দিস।না ,হলে শীরের অসুখ বাঁধবে ।
এভাবেই পরিবারের সকলের ভালোবাসা ও যত্নে আত্তিতে লাইকা বাড়তে লাগলো একটু একটু করে ।
বাংলাদেশী কুকুরের আদলে নয় বরং ভিন্ন গড়ন তার। লাইকার লেজটির আগার ভাগ সাদা গোড়ার ভাগ কালো।
লেজের লোম গুলো এত বড় আর ঘনযে, লাইকা যখন দৌড়ায় ওর লেজ কাঁশফুলের মাথা দুলতে থাকে। দেখে হয় একগুচ্ছ কাঁশফুল ফোটে আছে। আর আলতো বাতাসে দুলছে। লাইকার চলার ভঙ্গি রাজার মতো। দেখতে ও তেমনি লাগে। এই এলাকার সবাই মুখে এখন নাবিলের কুকুর লাইকার গল্প।
লাইকা এখন পরিপূর্ণ একটা কুকুর। লাইকার জন্য এ বাড়িতে অপরিচিত কেউ আসতে ভয় পায়। এমন কি ভিক্ষুকরা ও।
অপরিচিত কেউ বাড়িতে ঢুকলে লাইকা দৌড়ে তার চারপাশে ঘুরতে থাকে আর ঘেউ ঘেউ করতে থাকে তার ধারালো দাঁত খিঁচিয়ে।
দেখলে ভয় পাবারই কথা অন্যান্য কুকুরের চেয়ে লাইকার আকৃতি অইেশ বড়। আর এতো বড় একটা কুকুর চারপাশে ঘুরে ঘুরে ঘেউ ঘেউ করতে থাকলে যে কারোর প্রান শুকিয়ে যায় ভয়ে । মাঝে মাঝে নাবিল স্কুলে যাবার সময় লাইকা পিছু নেই। নাবিল বার বার বলে লাইকা বাড়ি চলে যা।কে শুনে কার কথা।
লাইকা পিছু চলতেই থাকে। শেষমেষ ২টাকা দিয়ে একটা রুটি কিনে সামনে দিলে রুটিটা মুখে নিয়ে দাঁতে কামড়ে ধরে লাইকা। নাবিল তার গলায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে এবার বাড়ি যাও….আমি একটু পরেই আসছি যাও….। আর দেরি করেনা রুটির টুকরো মুখে নিয়ে বাড়ি দিকে দৌঁড়ে যায়।
ভালোবাসা, মমতা বোঝার ক্ষমতা আল্লাহ সাবাই কে দিয়েছেন এমনকি পশু প্রাখিদের কে ও।সারা দিন স্কুলে কাটানোর পর নাবিলের পা বাড়িতে পড়ার আগে টের পায় লাইকা। আমগাছের ছায়ায় ঘুমন্ত অবস্থায় থাকে সে বিকেলের সেই সময়টাতে। নাবিল উঠানে আসতে না আসতেই সে দৌঁড়ে গিয়ে ওর পায়ের সাথে মুখ ঘষতে থাকে। এতো দিন লাইকা এ বাড়ির একটাঅংশ হয়ে উঠেছে। তাকে ছাড়া যেন শুন্য লাগে বাড়িটা। সেদিন বিকালে বাবা মায়ের সাথে মেলায় গিয়েছে নাবিল আর তিথি।
সারাটা বিকাল খুব মজা করে কাটালো ভাইবোন। মেলাতে অনেক খেলনা, মুড়ি, মুড়কির দোকান, নাগরদোলায় চড়েছে তারা , মাটির খেলনা কিনতেও ভুল হয়নি। চটপটি খেয়ে বায়োস্কোপ দেখে রাত আটটার দিকে বাড়িতে ফিরলো ওরা।
ওদের দেখে লাইকা দৌড়ে কাছে এসে লেজ নাড়াতে লাগলো অনবরত। আজ সারা বিকাল নাবিলকে কাছে পায়নি লাইকা, তাই তার পায়ে নাকমুখ লাগলো বারবার।
নাবিল আলতো করে ওর পিঠে হাত বুলিয়ে দিলো খুশিতে বারবার সে লেজ নাড়তে লাগলো। মেলা থেকে নিয়ে আসা মুড়ি মুরকি লাইকাকে খেতে দিলো তিথি।
লাইকার খুশি যেন ধরেনা। মনের আনন্দে খেতে থাকে ও। লাইকা এমন ভাবে বড় হয়েছে এ বাড়িতে সে যেন একজন বন্ধু। লাইকা এ বাড়ি আসার পর একটা চকলেট, চিপস ও যদি ওরা খায় তবে লাইকার জন্য কিছু অংশ রেখে দেয়।
ঘুটঘুটে অন্ধকার চারপাশে। দুই একটা জোনাক আপন খেয়ালে সাঁতাড় কাটছে অন্ধকারে। আকাশের তারারা মিটিমিটি করে হাসছে। সারা বিকেল বাইরে থাকার কারণে খুব ক্লান্ত ওরা আজ। রাতের খাবার আজ আগেভাগেই শেষ করে লাইকার খাবার খেতে দিয়ে ওরা তাড়াতাড়ি ঘুমানোর আয়ে াজন করছে ।
লাইকাকে দুধভাত খেতে দিয়ে তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে নাবিল। লাইকা দুধভাত খেতে ব্যস্ত আর পাশে বসে নাবিল মুগ্ধ চোখে চেয়ে আছে সেদিকে। খাবার শেষ হলো দু‘জনে মিলে পায়চারী করে কিছুক্ষন।
নাবিল পায়চারী করতে করতে দাঁত ব্রাশটাও সেরে ফেলে। দরজার সামনে ছোট পাপোশ পাতা থাকে লাইকার জন্য। সারা রাত সে ওখানে বসে বাড়ি পাহারা দেয়।
আজ চারপাশটা বড্ড নিরব। সবাই ঘুমিয়ে গেছে বহু আগেই। পাপোশে বসে মাথা তুলে তাকিয়ে আছে লাইকা । একটা খসে পড়া পাতার শব্দ ও তার কান র্স্পশ করে। তবুও কান খাড়া করে বসে থাকে সারা রাত। চোরেদের কাছেএ বাড়ি এখন একটা ভীতির কারণ। গত মাস দুই আগে । এক ছেঁচড়া চোর এসেছিলো বাইরে থাকা বোল বালতি কিংবা টুকটাক ছোট জিনিস চুরি করতে। এ ধরনের চোরগুলো বেশির ভাগই নেশার জন্য চুরি করেবেড়ায়। সে চোরটাকে কোনটাসা করে ফেলেছিলো লাইকা। একটা বৃত্তের ভেতর ঘুওে ঘুওে ঘেউ ঘেউ কওে ডেকে চলচিলো অবিরত। ওর ঘেউ ঘেউ শব্দে জেগে উঠে বাড়ির লোক সহ পাশের বাড়ির লোকজনও। তারপর চোরটিকে উত্তম মাধ্যম দিয়ে বিদায় করে। তারপর থেকে আর এ বাড়িতে চোর আসেনা। অন্যান্র কুকুরের চেয়ে ওর শ্রবন আর ঘ্যান শক্তি বেশ প্রখর। বাড়িতে অন্য কিছুর উপস্থিতি সে সহজেই টের পায়।
রাত এখন দ্বীপ্রহরের শেষ সময় । পাপোশের উপর বসে থাকা লাইকার চোখে ছোট ছোট ঘুম জমা হতে থাকে। একটু একটু কওে ক্লান্ত হয়ে আসছে তার কান চোখ।
হঠাত ,রান্না ঘরের এই দিকটা থেকে খচখচ ফোঁস ফোঁস আওয়াজ আসছে।দৌঁড়ে গেল সেদিকে, একটা গোঁখড়া সাপ ইদুঁর শিকার করেছে । আরপেশির জোওে সেটার দম বন্ধ কওে দেবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে সাপটি।
মাটিতে হাত পা ছুঁড়ে মুক্তির জন্য বিধাতার দরবারে শেষ ফরিযাদ জানাচ্ছে ইঁদুরটি। লাইকা নির্ভয়ে সামনে গিয়ে সমানে ঘেউ ঘেউ করতে লাগলো। সাপটি তার অবস্থানে অনড়। ইঁদুরটিকে ছাড়ার কোন নাম গন্ধ ও নেই। লাইকা এবার রেগেমেগে ওর ধারালো দাঁত বের করে কামড়ে দিতে গেল সাপটিকে। আপন প্রাণের মায়া করে সাপটি ছেড়ে দিলো তার শিকার। হারাতে হারাতে ফিরে পাওয়া জীবন নিয়ে ইঁদুরও ছুটলো নিজের পরিবারের কাছে।
সাপটির পালানোর পথ রোখে দাঁড়ালো লাইকা। বাঁধাগ্রস্ত হয়ে সাপটি হন্তদন্ত হয়ে ছুটতে লাগলো নাবিলদের শোবার ঘরে। সাপটির লেজ কামড়ে ধরে নেটে উঠনের একপাশে ছুঁড়ে দিরো লাইকা।এবার রাগে ফোঁসে উঠলো গোঁখড়াও। ফনা তুলে এগিয়ে এলো। তারপর শুরু হলো লড়াই।
অনেকক্ষন ধরে চললো লাইকা আর গোখড়ার লড়াই । শেষমেষ গোখড়া পরাজিত হয়ে মৃত্যু বরণকরলো। গর্ত থেকে বেরিয়ে এসে পাশে দাঁড়ালো আরো ৩টি সাপ । এগিয়ে এলো ফনা তুলে। পিছু পা হলোনা সাহসী লাইকা । নিজের উপর আছে তার অগাধ বিশ্বাস।এগিয়ে এলো সে নিজেও ৩টি সাপের সাথে একা লড়াই করতে আক্রমর্নাতক ভঙ্গিতে এগিয়ে গেল।
সাপ ৩টি আলাদা হয়ে একেক দিকে ছুটতে লাগলো। একটি সাপ ঘরের দোরের কাছাকাছি চলে আসলে লাইকা তার সামনে এগিয়ে গিয়ে কামড়ে দেয় ঘাড়ে । অন্য সাপ ২টি আবারো এগিয়ে এলো লাইকার দিকে।
দুজন মিলে আক্রমন করলো ও ঘাড়ে বিষ দাঁত বসিয়ে দিলো। তবুও যেন কিছু হয়নি ওর নিজের ধারালো দাঁত বসিয়ে ছিড়ে ফেললো এক গোখড়ার নাভির কাছের অনেকটা জায়গা।
শূন্যে ছুঁড়ে দেয়া সাপটি একটু দূরে গিয়ে পড়েছিল। সেটি ও এসে যোগ হলো, ৩টি সাপ একত্রে আক্রমন করলো লাইকাকে। ততক্ষনে বিষের যন্ত্র শুরু হয়ে গেছে ওর সারা শরীরে। জীবনে আর কোন
পরোয়া নেই যেন। ৩টি গোখড়াকে একাই কামড়ে ক্ষত বিক্ষত করে দিলো। ধারালো থাবা বসিয়ে এবরো থেবরো করে দিলো সাপের পেটের নরম অংশ। দুটি সাপ নড়াচড়ার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে খুব দ্রুত নিঃশ্বাস নিচ্ছে।
অন্যটি আরো একবার ফনা তুলে এগিয়ে আসতেই লাইকা সজোড়ে কামড় বসিয়ে দিল সাপটির মাথায়। সাপটির ঘাড়ের বেশীর ভাগ অংশ ছিড়ে নিলো ধারালো দাঁতের কামড়ে।

সাপটি নেতিয়ে পড়লো মাটিতে। অস্বাভাবিক যন্ত্রনায় মাটিতে গড়াগড়ি খেতে থাকে লাইকা। চোখে অন্ধকার দেখতে থাকে সে। একবার উঠে এসে দরজায় মাথা দিয়ে গুতো দিয়ে কুন কুন শব্দ করলো কয়েকবার। নাবিলের র্স্পশ পাবার শেষ চেষ্টা ছিল হয়তো এটা । তারপর উর্পযপরি মাটিতে গড়াগড়ি খেতে থাকলো টালমাটাল ভাবে। তার ধারালো নখের আঁচড়ে মাটির বুকে আঁকা হয়ে রইল অনেক যন্ত্রনায় এই নিকষ চিত্রকল্প।
অনেক যুদ্ধ শেষে প্রান পাখিটি জয়ী হয় খাঁচা থেকে বের হয়ে মুক্তির স্বাদ নেয়। সকাল বেলা দরজা খুলে উঠানের মাঝখানে প্রানহীন লাইক কে পড়ে থাকতে দেখে ভয়ে চিৎকার করে উঠেনাবিলের মা।
হায় আল্লাহ্ একি হলো! হায় আল্লাহ্ লাইকা। মায়ের র্আতনাদ শুনে একে এক ঘুম থেকে উঠোনে এসে দাঁড়ায় নাবিল, তিথি, ওতার বাবা। নাবিল কাছে গিয়ে হাত বুলাতে থাকে লাইকার ঘাড়ে। নাবিলের চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে। চেয়ে থাকা লাইকার চোখ দুটি অনেক না বলা কথা বলে যাচ্ছে যেনো নাবিলকে। মুখটা হাঁ করে আছে ও মুখের পাশে সাদা ফ্যানা লেগে আছে। গালে বড় লোমের কারনে কামড়ের ক্ষতগুলো চোখে পড়লোনা কারোর। তিথিবাবাকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। নাবিল তখনো একই ভাবে বসে আছে। অনুভ’তিহীন লাইকার গায়ে আদর মেখে দিচ্ছে বারবার।। রান্না ঘরের সামনে থেকে আবারো মায়ের চিৎকার। দৌড়ে গেল সবাই।
রান্ন্া ঘরের সামনে একটা মৃত ইঁদুর। একটি ক্ষত বিক্ষত মৃত গোখড়া। একসময় সারা বাড়িতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ৩টি মৃত গোখড়া ও চোখে পড়লো সবার।
কারো আর বুঝতে বাকী রইলোনা। লাইকা চারটা সাপের সাথে একা লড়াই করে বীরের মতো মারা গেছে। বিষের নীল ছোবলই লাইকার মৃত্যুর কারন।
ততক্ষনে গ্রামের সবার কানে পৌঁছে গেছে লাইকার বীরত্ব।
দলে দলে লোকজন আসতে লাগলো এক নজর লাইকা নামক বীরটিকে শেষ দেখা দেখতে।
র্দীঘ দিন সবার মুখে বীরত্বের গল্প ভেসে বেড়ালো । নাবিলের চোখের সামনে লাইকা ভাসে সব সময়। খেতে বসলে, বাইরে গেলে, স্কুলে গেলে, বিকালে মাঠে খেলতে গেলে লাইকার স্মৃতি কাঁদায় নাবিলকে। কোথায় ছিলো না লাইকা তার সাথে।
পড়ালেখার প্রতি অমনোযোগী হয়ে উঠে প্রিয় বন্ধু হারানো শোকাতুর নাবিল। ছেলের জন্য চিন্তিত হয়ে উঠেন বাবা-মা। নাবিলের মন ভালো করতে বাবা মা সিদ্ধান্ত নিলো তাকে ক’দিনে জন্য নানুবাড়ি বেড়াতে নিয়ে যাওয়া হোক। তাতে লাইকাকে ভুলে সে হয়ত আবার লেখাপড়ায় মনোযোগী হতে পারবে এমন প্রত্যাশায়। সবাই এখন লাইকাকে নিয়ে গর্ব করে কথা বলে, তার বীরত্ব মানুষের মনে অমলিন হয়েরইবে হয়তো র্দীঘ কতক যুগ। কিন্তু, তারা কেউ জানেনা কেউ একজন নিরবে কাঁদে, নি:শব্দে কাঁদে আকাশের দিকে চেয়ে চেয়ে। হাজারো তারার ভিরে লাইকা নামের কোন তারা আছে কী না ঈশ্বরের কাছে রোজ প্রশ্ন করে চোখের জলে।

Facebook Comments