গল্পঃ নিস্তব্ধ দুটি চোঁখ

গল্পঃ নিস্তব্ধ দুটি চোঁখ

মা প্লিজ বাবাকে বোঝাওনা মাত্র পরীক্ষা শেষ হলো। আমি আরো পড়তে চাই। এখন বিয়ে করবনা আমি। মাকে জড়িয়ে ধরে বার বার আকুতি মিনতি করছে রুহি। এসএসসি পরীক্ষা শেষ হতেই রুহির বাবা মেয়েকে বিয়ে দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। মা বললেন, তুই তো জানিস তুর বাবার কথার উপর কথা বলা নিষেধ। কি করবি মা, মেনে নে। রুহি নিরবে চোখের পানি ফেলে। তারপর ফুফু, খালা, চাচি অনেককেই ধরেছে কিন্তু কাজ হয়নি। একবার ভাবে রুহি, কোথাও চলে যাবে, আবার ভাবে সুইসাইড করবে কিন্তু কিছুই করার সাহস পায়না। মা-বাবা এত কষ্ট করে বড় করেছেন ভেবে নিজেকে শান্তনা দেয় রুহি।

রেজাল্ট বেরুবার আগেই বিয়ে হয়ে যায় রুহির। কত স্বপ্ন ছিলো চোখে! পড়ালেখা শেষ করে কিছু একটা করবে। ক্লাসের ফাস্ট ছাত্রি ছিলো রুহি। শুধু পড়া লেখা নয়, নাচ গান, খেলাধুলা সবকিছুতেই ফার্স্ট ছিলো ও। ব্যবসায়ী পাত্র, ছোট ফ্যামিলি। পাত্রের বড় ভাই বিদেশ আর পাত্র দুই নাম্বার। তিন বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। যদি হঠাৎ কিছু হয়ে যায় তখন একমাত্র মেয়ের বিয়েটা দেখে যাওয়া হবেনা, তাই পাগল হয়ে গেলেন রুহির বাবা। ছেলে পক্ষ অনেক গহনা দেবে, কাবিনও অনেক। আর এক মেয়ে দেশের বাইরে নয় দেশেই বিয়ে দিতে চান। তারাহুরু করে বিয়ে হলো। বিয়ের রাতে রুহি ওর জা কে বললো, ভাবি আজ রাতটা আপনার সাথে ঘুমাবো।জা মুচকি হেসে বলল, কেনো বাপু ভয় পাচ্ছো নাকি?

রুহি, জ্বি ভাবি আমার ভীষন ভয় করছে।

জা-ভয় নেই, স্বামির সোহাগে সব ভয় কেটে যাবে।বলে হাসতে লাগলেন জা। আর লজ্জায় লাল হয়ে গেলো রুহি।

বাসর ঘরে ঢুকলেন রুহির বর মিজান। যদিও এর আগে রুহির সাথে তার কোনো কথা হয়নি, রুহি ভেবেছিলো বর এসে আস্তে আস্তে কথা বলে রুহিকে ইজি করবে, না হলো স্বপ্ন পুরন। স্বামীর ভালবাসা না হয় সব কষ্ট দূর করে দেবে। সারারাত গল্প করে কাটিয়ে দেবো দুজন। কিন্তু এর কিছুই হলনা। এসেই রুহিকে জড়িয়ে ধরে টেনে হেছঁড়ে কাপড় খুলতে থাকে মিজান। সে এক ভয়ঙ্কর রুপ। ভয়ে বরের পায়ে পড়ে রুহি, কিন্তু তাতে কাজ হলনা। পরে বুঝতে পারল বরটা আসলে বিকৃত রুচির মানুষ। রুহির কাকুতি মিনতি সে আরো ইনজয় করছিলো। প্রথম রাতেই সে পাঁচবার ধর্ষন করে রুহিকে। রুহি এই শারীরিক সম্পর্ককে ধর্ষন মনে করে। শুধু কাগজের বৈধতা দেখিয়ে মনের বিরুদ্ধে মিলন ধর্ষনইতো! বিয়ের পর এ মিলন অত্যাচারে পরিনত হয়, শরীর খারাপ হোক বা ভালো, কোনো ছাড় নেই।রাতে বিভিন্ন কালারের নাইটি পড়িয়ে যেমন ইচ্ছে হয় স্বামির তেমন ভাবেই মিলতে হয়।

বিয়ের পনেরো দিন পর রেজাল্ট বের হয়। রুহি গোল্ডেন এ+ পায়। স্বামীকে ভয়ে ভয়ে বলেছিলো কলেজে ভর্তি হবার কথা। মিজান উত্তর দিয়েছিলো, এতো পড়ে কাজ নেই, মেয়েরা বেশি পড়লে ডানা গজায়, বুঝলা?

বছর না পেরুতেই সন্তান সম্ভবা হয় রুহি। স্বামীকে না করেছিলো রুহি। কিন্তু স্বামী বললো-কেনো বাচ্চা না হলে সুবিধা তাইনা? আরও কারো সাথে প্রেম করতে পারবে। তা হতে দিচ্ছিনা।

বিয়ের পর কোথাও বেড়াতে নিয়ে যায়নি স্বামী। মন খুলে কোনো কথা হয়নি বলা স্বামীকে। ভালবাসা বলতে কিছু নেই দুজনার মাঝে। বাচ্চা পেটে নিয়ে কত কষ্ট করে রুহি। শাশুড়ি বেশি খেতে দিতেন না, বলতেন বাচ্চা বড় হয়ে যাবে তখন অপারেশন লাগবে। এসময় যত কম খাবে তত ভাল। ডাক্তারেও যাওয়া নিষেধ। এ সময় পুরুষ মানুষ না দেখাই ভালো, গোনাহ হবে।

ওদিকে ছেলে প্রতি রাতে ল্যাপটপে নতুন নতুন পর্ন ভিডিও এনে বউকে দেখায় জোর করে, আর সেভাবেই বিকৃত যৌনাচারে লিপ্ত হয় বউয়ের সাথে, তাতে গোনাহ নেই। অবশ্য শাশুড়ি তো জানেন না তার ছেলের কুকীর্তি। বাপের বাড়িও যেতে দিতনা স্বামী-শাশুড়ি।

অনেক কষ্টে ছেলে সন্তানের জন্ম দেয় রুহি। জন্মের সময় রক্তও লেগেছে দু’ব্যাগ। অবস্থা ভালো ছিলনা ডেলিভারির সময়। তাই অপারেশন লাগে। বাচ্চা কিভাবে লালন পালন করবে বুঝতে পারেনা রুহি।সংসারই ভালোমত বুঝে উঠতে পারেনি, তারপর আবার বাচ্চা!

সংসারের বেশিরভাগ কাজ রুহিকে করতে হয়। ভাসুর বিদেশ থাকায় বড় জা বেশিরভাগ বাপের বাড়িতে থাকে। ননদ, ননাশ এলে যত কাজ একাই রুহি করে। শাড়ী পড়তে পারতনা বলে শাশুড়িকে বলেছিলো ড্রেস পড়বে, তাতেও নিষেধাজ্ঞা। তাই শাড়ীই পড়তো ও। তারপরও শাশুড়ির অভিযোগের শেষ নেই। কিছুদিন ধরে প্রায় সময়ই নিরবে বসে কি যেনো ভাবে রুহি, ছাদে গেলে আনমনে চেয়ে থাকে আকাশের দিকে, মা-বাবার উপর ভীষন রাগ হয় তখন- ছাদ থেকে যখন নিজের বয়সি মেয়েদের কলেজে যেতে দেখে।

রুহির বান্ধবিরা এখনও পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত আর রুহি সংসার, বাচ্চা সামলাতে ব্যস্ত। এসব ভেবে চোখের পানিতে গাল ভেসে যায়। চোখ মুছে ঘরে আসে। হঠাৎ হঠাৎ বাচ্চার কান্না শুনলে রাগ ওঠে, হাত তুলতে গিয়ে থেমে যায়। বাচ্চার কি দোষ! সব দোষতো নিয়তির।

সারাদিন কাজ করে, বাচ্চা সামলিয়ে প্রতিটা রাতে স্বামির জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। তার চাহিদা মিটিয়েই শেষ নয়, সে না ঘুমানো পর্যন্ত পা টিপে দিতে হয়। কাপড় ইস্ত্রি করা না থাকলে করে রাখতে হয়। ক্লান্ত শরীর নিয়ে বিছানায় যেতেই বাচ্চা উঠে গেলে সাথে সাথে বাচ্চাকে সামলাতে হয়, বাচ্চার কান্নায় স্বামীর ঘুম ভেঙে গেলে দু’একটা চড়ও সহ্য করতে হয়। আর ভালো লাগেনা। মাঝে মাঝে ভাবে রুহি, লোকটার কি শুধু একটা শরীরই দরকার ছিলো? মনের দরকার ছিলো না?

সেদিন বারান্দায় কাপড় শুকাতে এসে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো রুহি, পাখিদের উড়ে যাওয়া দেখে ভাবে, ইস যদি পাখি হতাম! এমন সময় বাচ্চার চিৎকার শুনে দৌড়ে যেতে লাগলো অমনি তারে মেলা ব্লাউজে চুল আটকে গেলো, বিরক্ত হয়ে চুল ছোটাতে গিয়ে অনেক চুল ছিড়ে গেলো। সেদিকে না তাকিয়ে ছুটে গেলো রুহি। গিয়ে দেখে শাশুড়ির কোলে বাচ্চা। রুহিকে দেখেই শুরু করলেন চিৎকার, কোথায় থাকো? একটা বাচ্চা সামলাতে পারোনা, আমরা এতগুলা বাচ্চা পালিনি?সংসার করিনি? কখন তোমাকে চা মেলাতে বলেছিলাম? চায়ের কথা বলতেই রুহির মনে পড়লো চুলায় চা বসানো। দৌড়ে গেলো রান্নাঘরে। ততক্ষণে চায়ের পানি শুকিয়ে হাড়ি জ্বলে গন্ধ বেরিয়েছে। পেছন পেছন শাশুড়িও এলেন। এসব দেখে আরো ক্ষেপে গেলেন। বললেন, বাচ্চা রেখে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেবো। এভাবে যা মুখে আসছে তাই বলে যাচ্ছিলেন। কিন্তু রুহি কেমন ঘোরের মধ্যে আছে তখন। শাশুড়ির অন্য কথাগুলা কানে যাচ্ছেনা, শুধু ‘বাচ্চা রেখে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেবো’ এই কথাটাই শুনতে পাচ্ছে রুহি। ও যেনো একটা ঘোরের মধ্যে আছে। নরমালি ছেলেকে শাশুড়ির কোল থেকে আনতে হাত বাড়ায়। রুহির আচরনে ক্ষীপ্ত হয়ে শাশুড়ি চড় মারতে লাগলেন রুহিকে, অনেকগুলো চড়। মারতেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায় রুহি। ঘরের মেঝেতে বসে আছে রুহি। মা ওর ছেলেকে কাছে নিয়ে আসে। কিন্তু রুহি আর সেদিনের মত হাত বাড়ায়না। নিস্তব্ধ দুটি চোখে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। শুধু ছেলে নয় কাউকেই চিনতে পারেনা ও। সেদিন অনেক্ষন অজ্ঞান থাকার পর রুহির জা আর শাশুড়ি মিলে ক্লিনিকে নিয়ে গিয়েছিলো। রুহির যখন জ্ঞান ফেরে তখন ও কাউকেই চেনেনা। কারো সাথে কথা বলেনা।

এক সপ্তাহ ক্লিনিকে থাকার পর জানা যায় রুহি নিউরোসিসে আক্রান্ত। রুহির স্বামী আর শাশুড়ি রুহির বাবা-মাকে বললো, কিছুদিন থাক ও আপনাদের ওখানে। ভালো হলে নিয়ে আসবো।রুহির বাবা-মা আর প্রশ্ন করেননি, যদি ভালো না হয়? প্রশ্ন করেননি, কারন তারা জানেন ভালো না হলে তারা আর রুহিকে নেবেন না। প্রশ্ন করেননি, কারন তারা জানেন রুহির এ অবস্থার জন্য তারাই দায়ী।

রুহি প্রায়ই ফোন করে কাঁদতো। মাকে বলতো, মাগো আমি মনে হয় পাগল হয়ে যাবো। প্লিজ আমাকে এখান থেকে মুক্ত করো। বাবার বাড়ি যাবার জন্য অস্থির হতো কিন্তু স্বামী যেতে দিতনা। তার প্রতি রাতে খাবার দরকার। একটা শরির দরকার যে শরীরকে দুমড়ে মুচরে কোবলে কোবলে ভোগ করা যায়। রুহির ফোনের উত্তরে বাবা-মা বলতেন, স্বামি না দিলে কিভাবে আনবো মা? স্বামীর অবাধ্য হতে নেই। কখনও রুহিকে বোঝেনি কেউ। ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে আর বিয়ের পর মেন্টালি টর্চারে আস্তে আস্তে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়তে থাকে রুহি। যার পরিনতি আজ সে মানসিক রোগি।

লেখক: হেনা আহমেদ

১১ আগস্ট ২০১৭

Facebook Comments