নিউজটি পড়া হয়েছে 151

সৌন্দর্যের লীলাভূমি হাকালুকি হাওরে এখন শুধুই কান্না।

হাকালুকি হাওর বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ হাওর। এটি এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি। এর আয়তন ১৮,১১৫ হেক্টর, তন্মধ্যে শুধুমাত্র বিলের আয়তন ৪,৪০০ হেক্টর। এটি মৌলভিবাজার জেলার বড়লেখার (৪০%), কুলাউড়া (৩০%), এবং সিলেট জেলার ফেন্সুগঞ্জ (১৫%), গোলাপগঞ্জ (১০%) এবং বিয়ানিবাজার (৫%) জুড়ে বিস্তৃত।

উত্তরে ভারতের মেঘালয় পাহাড় এবং পূর্বে ত্রিপূরা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত। এই হাওরে ৮০-৯০টি ছোট, বড় ও মাঝারি বিল রয়েছে, শীতকালে এসব বিলকে ঘিরে অথিতি পাখিদের বিচরণে মুখর হয়ে উঠে গোটা এলাকা।

“সাগর” শব্দটি থেকে “হাওর” শব্দের উৎপত্তি বলে ধরে নেয়া হয়। তবে “হাকালুকি” নামের উৎপত্তি সম্পর্কে বিভিন্ন লোককাহিনী রয়েছে।

জনশ্রুতিমতে, বহু বছর আগে ত্রিপূরার মহারাজা ওমর মানিক্যের সেনাবাহিনীর ভয়ে বড়লেখার কুকি দলপতি হাঙ্গর সিং জঙ্গলপূর্ণ ও কর্দমাক্ত এক বিস্তীর্ণ এলাকায় এমনভাবে লুকি দেয় বা লুকিয়ে যায় যে, কালক্রমে ঐ এলাকার নাম হয় “হাঙ্গর লুকি”, ধীরে ধীরে তা “হাকালুকি”-তে পর্যবসিত হয়। আরেকটি জনশ্রুতি অনুযায়ী প্রায় দুই হাজার বছর আগে প্রচন্ড এক ভূমিকম্পে “আকা” নামে এক রাজা ও তাঁর রাজত্ব মাটির নিচে সম্পূর্ণ তলিয়ে যায়। কালক্রমে এই তলিয়ে যাওয়া নিম্নভূমির নাম হয় “আকালুকি” বা হাকালুকি। আরো প্রচলিত যে, এক সময় বড়লেখা থানার পশ্চিমাংশে “হেংকেল” নামে একটি উপজাতি বাস করতো। পরবর্তিতে এই “হেংকেলুকি” হাকালুকি নাম ধারণ করে। এও প্রচলিত যে, হাকালুকি হাওরের কাছাকাছি একসময় বাস করতো কুকি, নাগা উপজাতিরা। তাঁদের নিজস্ব উপজাতীয় ভাষায় এই হাওরের নামকরণ করা হয় “হাকালুকি”, যার অর্থ ‘লুকানো সম্পদ।

বাংলাদেশের সর্ববৃহত এই হাওরে শীতকালে প্রচুর অথিতি পাখি বেড়াতে আসে। গড়ে তুলে তাদের অভয়াশ্রম। হাজারো প্রজাতি লাখো পাখির কিচিরমিচির আওয়াজে মুখরিত হয় হাওর পাড়ের এলাকা। বিশেষ করে হাওর পাড়ের একটি গ্রাম হাল্লা’র সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন একটি বাড়ি রয়েছে যেটি বর্তমানে “পাখি বাড়ি” নামে সুপরিচিত। সরকারের বিশেষ উদ্দ্যোগ ও স্থানীয়দের আন্তরিকতায় গড়ে উঠেছে পাখিদের একটি অভয়ারণ্য। প্রতি বছর শীত আসলেই পাখিরা ভীড় জমায় এই বাড়ির আশেপাশে। পাখি বাড়ির প্রতিটি গাছে ডাল-পালায়, শাখা-প্রশাখায় গড়ে তুলে তাদের স্বপ্নের নীড়। যারা হাকালুকিতে গিয়েছেন অথচ একটিবারের জন্য পাখি বাড়িতে যাননি আমি বলবো তারা হাকালুকির সৌন্দর্যের অনেকাংশই উপভোগ করতে পারেন নি।

সম্প্রতি, স্থানীয় সরকারের উদ্যোগে হাকালুকির হাল্লা গ্রামের পাশেই গড়ে তুলা হয়েছে একটি সুউচ্চ “ওয়াচ টাওয়ার”। যেটির মাধ্যমে টাওয়ারে থেকেই বিস্তির্ন হাকালুকির অনেক দৃশ্যই উপভোগ/পর্যবেক্ষন করা করা যায়। বিশেষ করে সন্ধায় পানির বুকে সূর্যাস্ত খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ করে দিয়েছে এই ওয়াচ টাওয়ার।

হাকালুকি হাওরে অনেকেই আসেন নৌকা ভ্রমনের জন্য। শান্ত পানিতে স্বপরিবারে বা স্ববান্ধব নৌকায় ভ্রমনের যেনো কোনো জুড়ি নেই। নৌকায় ভ্রমনকালে দেখা যায় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, পাখি। মাঝেমধ্যে দেখা মিলে গাঙ্গচিলের। সবমিলিয়ে প্রকৃতির এক অসাধারন দান এই হাকালুকি হাওর।

হাওর পাড়ের মানুষদের জীবিকা নির্বাহের প্রধান খাত হলো, ধান চাষ। প্রতিটি মওসুমেই তারা বিভিন্ন জাতের ধান ফলান। বিশেষ করে বুরো ধানের ফলন সবচেয়ে বেশী পরিমানে হয়। তাদের ফলানো ধান প্রতিবছর তাদের নিজস্ব চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করে দেশের খাদ্যর যোগান দিতে অপরিসীম ভূমিকা রাখে।  কিন্তু এবার পানির কারনে হাওর পাড়ের হাজারো কৃষকের সন্তানসম এসব ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। বেড়েছে হাহাকার, কষ্ঠ।

শুধু এপর্যন্ত হলেই ঠিক ছিলো, কিন্তু এবার যেনো বিধাতার অভিশাপ পিছু নিয়েছে হাওড় পাড়ের মানুষদের। পানিতে তলিয়ে যাওয়া এইসব ধান পচে গিয়ে পানিতে তৈরী হয়েছে এক ধরনের বিষক্রীয়া। সেই বিষক্রীয়ার ফলে পানির মাছ মরে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে আরো একধরনের দূর্যোগ। স্থানীয়দের পায়ের তলার মাটি যেনো সরে যেতে থাকে।

ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের কারণে উজানে প্রচুর পাহাড় থাকায় হাকালুকি হাওরে প্রায় প্রতি বছরই আকষ্মিক বন্যা হয়। প্রতিবছরের ন্যায় এবছরও হাকালুকি হাওর বন্যা কবলিত হয়েছে। তলিয়ে গেছে হাওর পাড়ে থাকা হাজারো গ্রাম। পানিবন্দী হয়েছে এসব গ্রামে থাকা প্রায় সাড়ে তিনলক্ষ মানুষ। পানির তোড়ে ভেসে গেছে হাজারো ভিটে বাড়ি, গবাদি পশু অনেক কিছুই। দিন-রাত পরিশ্রম করে ফলানো ধান সহ অন্যন্য সকল ফসল। হাওর পাড়ের মানুষদের দ্বিতীয় আয় বা বেঁচে থাকার উপকরন হিসেবে যেটিকে বলা হয় সেই মাছ ও এইবার পানিতে থাকা বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছে। যদিও এখন কিছু কিছু মাছ পাওয়া যাচ্ছে। সাধারনত প্রতি বছর যে বন্যা হয় সেটি খুব একটা ক্ষতি করেনা হাওর পাড়ের মানুষদের। প্রতিবারের বন্যা আশীর্বাদ হয়ে আসত মানুষদের কাছে। কারন বন্যা হলে তারা মাছ শিকার করতো। তারপর সেই মাছ দিয়ে নিজেদের পরিবারের অন্ন যোগানোর পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করতে পারতো। কিন্তু এবারের বন্যা তাদের সকল আশা অাকাঙ্ক্ষা হাওরের পানিতে বিলীন করে দিয়েছে। প্রতিদিন চলছে হাহাকার-হাহাজারি। ক্ষুদার জ্বালায় ছটফট করে অবুজ শিশুরা। এমন অনেক মানুষ আছে যাদের বাড়িঘর ভাসিয়ে নিয়ে গেছে পানিতে, আবার অনেকের বাড়ির চারপাশে শুধুই অথৈ পানি আর পানি। সরকার, স্থানীয় সরকার, বিত্তশালী, রাজনৈতিক ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রায় প্রতিদিন হাওরের বিভিন্ন এলাকায় ত্রান বিতরণ করা হচ্ছে। কিন্তু এসব পরিবার আশ্রয়কেন্দ্র বা বিতরন কেন্দ্রে গিয়ে যে ত্রাণ সংগ্রহ করবে সে সামর্থটুকুও তাদের নেই। বাড়ির চারিদিকেই শুধুই পানি, কিভাবে যাবে বিতরণ কেন্দ্রে? তাই আশায় থাকে কখন ত্রাণবাহী নৌকা তাদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাবে, পাশ দিয়ে কোনো নৌকা গেলেই ঘর থেকে বের হয়ে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করে তাদের দৃষ্টি আকর্ষনের।

অনেক সামাজিক সংগঠন আছে যারা বেশিরভাগই একটি নিদৃষ্ট জায়গায় নিয়ে গিয়ে বিতরণ করেন, পথে কাউকে দিতে চাননা বা দেননা। অনেকেই এখানকার স্থানীয়দের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্থদের তালিকা সংগ্রহ করে এবং তাদের মাঝেই বন্ঠন করেন।

কিন্তু একবারও আপনারা ভেবে দেখেছেন উনারা যে তালিকা আপনাদের দিচ্ছেন সেটি কতটুকু সঠিক ও সুষ্টু? এমন অনেক দেখা যায়, একজন প্রতিদিন কয়েক জায়গা থেকে ত্রাণ পাচ্ছেন, আবার অনেকে কয়েকদিনেও কোনো ত্রাণ বা সাহায্য পাচ্ছেন না। এর কারন কি? আমি বলবো এর কারন হচ্ছে তালিকা প্রস্তুতকারীদের স্বজনপ্রীতি। আমি উনাদের দোষ দিচ্ছি না, কারন উনাদের জায়গায় হলে আমিও হয়তো একি কাজ করতাম।

বর্তমানে হাকালুকির শতকরা ৯৫ ভাগ মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ ও অসহায়। উদাহরনস্বরুপ, আমাকে যদি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থদের তালিকা প্রস্তুত করার দায়িত্ব দেওয়া হতো তাহলে প্রথমে আমি আমার আশেপাশের মানুষজন, আমার আত্বীয়-স্বজনদের নাম সর্বাগ্রে তালিকাভূক্ত করতাম। কারন, উনাদের অসহায়ত্ব খুব বেশি করে আমার চোখের সামনে ফুটে উঠতো। হয়তো আমার পরিচিতরা প্রায়ই ত্রান সামগ্রী পাচ্ছে যদিও এটা তাদের জন্য পুরোপুরি যথেষ্ট না কিন্তু একেবারে অল্পও না। আবার একটু দূরের একজন দেখা গেলো কয়েকদিনেও কোনো ত্রাণ পায়নি এবং ওর সাহায্য পাওয়াটা আমার পরিচিতজনের চাইতেও বেশী দরকারি কিন্তু আমার কাছে মনে হবে আমার আত্বীয়ই সবচেয়ে বেশি অসহায়। এই দৃষ্টিকোন থেকেই তালিকাভুক্তিতে সুষ্টু বন্ঠন হয় না।

আপনাদের সবার কাছে অনুরোধ, মিনতি আপনারা যারাই যান না কেনো ত্রান বিতরণ করতে একটু সঠিকভাবে পৌছে দিবেন, অসহায় মানুষদের কাছে। একটু কষ্ট করে, সময় নিয়ে হাওরে ঘুরে ঘুরে সত্যিকারের অসহায় মানুষগুলোর কাছে পৌছে দিবেন আপনাদের সাহায্য-সামগ্রী। ওরা যে অধির অপেক্ষায়, প্রতিক্ষার প্রহর গুনছে আপনার। পরিশেষে একটাই কামনা হাঁসি ফুটুক অসহায়-দরিদ্রদের মুখে। শুভকামনা রইলো তাদের জন্য, যারা কিছুটা হলেও সাহায্য সামগ্রী দুর্গতদের মাঝে বিতরন করছেন।

তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া ও সরেজমিন পরিদর্শন।

লেখকঃ ফাহাদ আহমেদ।

২৮ জুলাই ২০১৭

ফেসবুক মন্তব্য
xxx