নিউজটি পড়া হয়েছে 371

ছোট গল্প : নিয়তি

 

          *** নিয়তি ***

      —— ফাহাদ আহমেদ

আকাশে বৃষ্টি হচ্ছে খুব। প্রবল বৃষ্টি, যেনো ভেঙেছুড়ে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে সব। সব ভেঙ্গে নিয়ে না গেলেও অবশ্য সুমিতের মন অনেক আগেই ভেঙ্গে খানখান হয়ে গেছে। কারন এই বৃষ্টিভেজা রাতেই নীলা বিষ খেয়ে আত্বহত্যা করবে। সুমিত সব জানে। কিন্তু সে নীলাকে বাধা দিতে পারবে না। কারন সে বাধা দিলে প্রকৃতির নিয়ম ভঙ্গ হবে। প্রকৃতির ছন্দ ভঙ্গ করার ক্ষমতা কারো নেই………

এই কে আছিস, এদিকে এক কাপ চা আইনা দে, রেষ্টুরেন্টের ক্যাশের চেয়ারে বসতে বসতে বললেন নুরুল সাহেব।

নুরুল সাহেব এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি। উনার ২ মেয়ে নীলা আর রুবা। সুমিতকে তিনি ছোটকাল থেকে লালন পালন করে মানুষ করেছেন। সুমিত এখন তার রেষ্টুরেন্টেই কাজ করে। উনার বাড়িতেই থাকে। ছেলে হিসেবে ভাল হওয়ায় উনি মনস্থ করেছেন সুমিতের সাথেই নীলার বিয়ে দিবেন।

চেয়ারে বসেই আবার ডাক দিলেন, এই সুমিত কই???

-জ্বী চাচাজান।

-কি অবস্থা তোমার, কেমন আছো?

-চাচাজান ভালোই আছি। আপনি?

-ভালো, রাইত অনেক হয়া গেলো বাড়ীতে যাবা না?

-জ্বী যাবো, একটু পরে।

-চলো একসাথেই যাই।

-জ্বী চাচা, চলেন।

বাড়িতে যাওয়ার পর খাওয়া দাওয়া শেষ করে সুমিত নুরুল সাহেবের পা টিপে দিতে লাগলো। এটা তার প্রতিদিনের অভ্যাস। নুরুল সাহেব গল্প করতে শুরু করলেন। ব্যবসার বিভিন্ন আলাপ, ব্যক্তিগত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ করতে করতে একপর্যায়ে ঘুম ঘুম চোখে বললেন, তুই বড় ভালা পোলা, আমি ঠিক করছি আমার বড় মেয়ে নীলামনির সাথে তর বিয়া দিমু। তর মত কি? সুমিত কোন উত্তর না দিয়ে নীরব বসে রইলো। একপর্যায়ে নুরুল সাহেব ঘুমিয়ে পড়লে সুমিত ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় গিয়ে একটি পাতানো চেয়ারে বসলো। তার চোখে অঝোর ধারায় পানি ঝরছে। না, সে কোনো কষ্ঠ পায়নি, তবে আজ রাতে ভীষন কষ্ট পেতে হবে। সে আকাশের দিকে তাকালো।

রাতের আকাশে খুব সুন্দর চাঁদ উঠেছে। চাঁদের আলোয় সবকিছুই যেনো দিনের মত পরিষ্কার। শীতের রাত, হালকা শীত শীত অনুভুত হচ্ছে। এরকম একটি রাতে বৃষ্টি আসা যদিও একটি অবাস্তব কল্পনা, কিন্তু এর পরেও আজ রাতে বৃষ্টি হবে, ভয়ংকর বৃষ্টি। মুষল ধারায় বৃষ্টি নামবে। আর এই বৃষ্টিভেজা রাতেই নীলা বিষ খেয়ে আত্বহত্যা করবে। সুমিত সব জানে। কিন্তু সে নীলাকে বাধা দিতে পারবে না। কারন সে বাধা দিলে প্রকৃতির নিয়ম ভঙ্গ হবে। আর নিয়ম ভঙ্গকারীকে প্রকৃতি পছন্দ করেনা।

সুমিতের অতি প্রাকৃতিক কিছু ক্ষমতা রয়েছে। যেমন সে চোখ বন্ধ করেই সেকেন্ডের মধ্য হিসেব করে বলে দিতে পারে আগামী একশ, পাঁচশ, লক্ষ কোটি বছর পরে পৃথিবীতে কি ঘটবে। চোখ বুঝলেই যেন তার সামনে এগুলো ভেসে বেড়ায়। তবে সে কি ঘটবে শুধু তা বলতে পারে, কেন ঘটছে, বা ঘটবে তার কোন ব্যাখ্যা বলতে পারে না। যেমন এই মুহুর্তে তার খুব ইচ্ছে করছে, নীলা আজ রাতে কেন আত্বহত্যা করবে তা জানতে। কিন্তু সে এটা কিছুতেই বুঝতে পারছে না। সে নীলাকে খুব ভালোবাসে। তার আজ ভীষন ইচ্ছে করছে নীলার আত্বহত্যাটা ঠেকিয়ে দিতে, কিন্তু সে খুব ভালো করে জানে এটা তার ক্ষমতার সম্পূর্ন বাইরে। পৃথিবীতে কি ঘটবে, কি ঘটবে না তা প্রথম ধূলিকণার সৃষ্টিলব্ধ থেকেই নির্ধারিত এক সূক্ষ হিসেবের জালে বেধে দেওয়া হয়েছে। এ জাল ভেদ করার সামর্থ কারো নেই।

সুমিত আবার আকাশের দিকে থাকালো, আকাশের পুর্নিমার চাঁদ কালো মেঘের আড়ালে খুব দ্রুত ঢেকে যাচ্ছে, দেখেই বোঝা যাচ্ছে বৃষ্টি নামবে একটূ পরেই। আকাশে বৃষ্টি নামবে একটু পরে, কিন্তু সুমিতের চোখে অনেক আগেই বৃষ্টি নেমেছে, বুকে জ্বালাপোড়া করছে, সুমিতের হাত থেকে সদ্য শেষ হওয়া বিষের শিশিটি ঝনঝন শব্দ তুলে পড়ে গেলো মেঝেতে, দ্রুত গড়াচ্ছে কিসের অদ্ভুত এক টানে।

চেয়ার থেকে গড়িয়ে নিচে পড়ে গেলো সুমিত, জ্ঞান হারানোর ঠিক আগ মূহুর্তে ঘরের চালে বৃষ্টির ফোটার টপাটপ আওয়াজ কানে ভেসে এলো।

২৩ জুলাই ২০১৭

ফেসবুক মন্তব্য