নিউজটি পড়া হয়েছে 181

জমজমের পানি।

সিলনিউজটুয়েন্টিফোরডটকম ::: জমজম মসজিদে হারামের নিকট অবস্থিত একটি প্রসিদ্ধ কূপ। পবিত্র কা’বা এবং এই কূপের মাঝে দূরত্ব হলো মাত্র ৩৮ গজের। জমজম নবী ইবরাহিম (আ.)-এর পুত্র নবী ইসমাঈল (আ.)-এর কূপ; যার পানি দ্বারা দুগ্ধপায়ী শিশু ইসমাঈলের তৃষ্ণা নিবারণ করা হয়েছিল। যখন শিশু ইসমাঈল খুব তৃষ্ণার্ত ছিলেন, তাঁর মা পানি অনুসন্ধান করলেন, কিন্তু পেলেন না। অতঃপর তিনি সফা পর্বতে আরোহণ করলেন এবং শিশুর পানির জন্য আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করলেন। তারপর তিনি মারওয়া পর্বতে চড়েও সমান দোয়া করলেন। আল্লাহ তায়ালা সেই দোয়া কবুল করলেন এবং ফিরিশতা জিব্রাইল (আ.) কে পাঠালেন। জিব্রাইল (আ.) পায়ের গোড়ালি দিয়ে জমিন খুঁড়লেন এবং সেখান থেকে পানি প্রবাহিত হতে লাগলো। পানির সেই প্রবহমান স্রোতকে জমজম কূপ হিসেবে আমরা জানি। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর কথা ও কর্মে জমজমের পানির বিভিন্ন ফজিলত ও বিশেষত্ব আমাদের জানিয়েছেন।

আলেমগণ বলেন, হজ ও ওমরাহ আদায়কারীর জন্য বিশেষভাবে এবং পৃথিবীর সকল মুসলমানের জন্য সাধারণভাবে জমজমের পানি পান করা মুস্তাহাব। সহিহ হাদিসে বিধৃত হয়েছে যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে জমজম থেকে পানি পান করেছেন। (সহিহ বোখারি: ১৫৫৬) হজরত আবু যর (রা.) বর্ণনা করেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, জমজমের পানি বরকতময়, স্বাদ অন্বেষণকারীর খাদ্য। (সহিহ মুসলিম: ২৪৭৩) মুসনাদে তায়ালুসিতে এই হাদিসের একটি বর্ধিত অংশ উদ্ধৃত হয়েছে যে, “এবং রোগীর ঔষধ। “হজরত আয়িশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের সাথে পাত্রে এবং মশকে করে জমজমের পানি বহন করতেন। তা অসুস্থদের ওপর ছিটিয়ে দিতেন এবং তাদের পান করাতেন। (তিরমিজি) এই বর্ণনা থেকে একথাও জানা গেল যে, জমজমের পানি বহন করা জায়েজ এবং যারা জমজম কূপের নিকটে নয়; তাদের পান করানো নববি কাজ।

জমজম থেকে পানকারী ব্যক্তির জন্য সুন্নত হলো, পুরোপুরিভাবে পরিতৃপ্ত হয়ে পান করা। ফকিহগণ জমজমের পানি পানের কিছু আদব উল্লেখ করেছেন, যেমন কিবলামুখী হওয়া, বিসমিল্লাহ বলা, তিন শ্বাসে পান করা, পরিতৃপ্ত হওয়া, শেষে আলহামদুলিল্লাহ বলা ইত্যাদি। বস্তুত জমজমের পানি যেন ইবাদত মনে করে পান করা উচিত।

জমজমের পানি পান করার সময় একটি বড় কাজ হলো দোয়া করা। হজরত জাবির (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, জমজমের পানি যে উদ্দেশ্য নিয়ে পান করবে তা পূরণ হবে। (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩০৬২) এজন্য আমরা পূর্বসূরি মনীষীদের জীবনেতিহাসে দেখতে পাই যে, তারা জমজম পানের সময় বিভিন্ন দোয়া করতেন। এখানে কয়েকজন মনীষীর উদ্ধৃতি পেশ করা হলো।

১. আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ূতি (রহ.) বলেন, হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি জমজমের পানি পান করেছিলাম স্মৃতিশক্তিতে হাফিজ শামসুদ্দিন যাহাবি (রহ.)-এর স্তরে পৌঁছার নিয়তে। সুয়ূতি বলেন, ইবনে হাজার ওই স্তরে পৌঁছে ছিলেন, বরং তার স্মৃতিশক্তি আরও অধিক প্রখর হয়েছিল। (তাবাকাতুল হুফফাজ, ১/৫২২)

হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) নিজে বলেন, আমার হাদিস শিক্ষাজীবনের প্রথমদিকে একবার আমি জমজম পান করলাম এবং আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করলাম যে, তিনি যেন আমাকে হাদিস মুখস্থ করার ক্ষেত্রে হাফিজ যাহাবি (রহ.)-এর অবস্থা দান করেন। তারপর যখন আমি বিশ বৎসর পর আবার জমজম পান করলাম এবং ওই স্তর থেকে বেশি কিছুর জন্য প্রার্থনা করতে মন চাইল, তখন আমি আরও উঁচু স্তরের জন্য দোয়া করলাম। আমি আশাবাদী যে, আল্লাহ তাও আমাকে দান করবেন। (মাওয়াহিবুল জালিল, ৩/১১৬)

২. আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ূতি (রহ.) জমজম পান করেন এই নিয়তে যে, আল্লাহ তায়ালা যেন তাকে ফিকহ শাস্ত্রে ইমাম সিরাজুদ্দিন আল বুলকিনি (রহ.)-এর স্তরে এবং হাদিস শাস্ত্রে হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.)-এর স্তরে পৌঁছিয়ে দেন।

৩. প্রসিদ্ধ মুফাসসির আল্লামা ইবনুল আরাবি (রহ.) বলেন, ৪৮৯ হিজরির জিলহজ মাসে আমি মক্কায় অবস্থান করছিলাম। আমি খুব বেশি করে জমজম পান করতাম। প্রত্যেকবার জমজম পানের সময় আমি ইলম ও ঈমানের নিয়ত করতাম। ফলে আল্লাহ তায়ালা এর বরকত আমাকে দান করলেন এবং আমি যথাসাধ্য ইলম হাসিল করলাম। কিন্তু আমলের নিয়তে জমজম পান করতে ভুলে গেলাম। হায়! যদি আমলের নিয়তেও পান করতাম, তবে আল্লাহ আমাকে ইলম ও আমল উভয়টির বরকত নসিব করতেন। কিন্তু তা হলো না। (আহকামুল কোরআন, ৩/৯৮)

৪. আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনে জাফর বলেন, হাদিস শাস্ত্রের প্রসিদ্ধ ইমাম ইবনে খুজায়মা (রহ.)কে জিজ্ঞেস করা হলো, এত ইলম আপনি কীভাবে অর্জন করলেন? প্রত্যুত্তরে তিনি বললেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘জমজমের পানি যে নিয়তে পান করা হয় অর্থাৎ তাই কবুল হয়। ‘আর আমি যখন জমজম পান করেছিলাম, তখন আল্লাহর নিকট উপকারী ইলম প্রার্থনা করেছিলাম। (সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১৪/৩৭০)

৫. ইবনে আসাকির বর্ণনা করেন যে, খতিব বাগদাদি (রহ.) জমজম পানের সময় তিনবারে পান করেন এবং আল্লাহর নিকটি তিনটি জিনিস প্রার্থনা করেন। ১. তার লেখা ‘তারিখে বাগদাদ’ গ্রন্থটি যেন তিনি নিজে বাগদাদে পড়িয়ে শোনাতে পারেন। ২. জামে মনসুর-এ যেন তিনি হাদিসের দরস দেওয়ার সুযোগ পান। ৩. তার দাফন যেন হয় বিশর আল হাফি (রহ.)-এর কাছে। বস্তুত আল্লাহ তায়ালা খতিব বাগদাদি (রহ.)-এর সবগুলো চাওয়া বাস্তবায়ন করে দিয়েছিলেন। (তাবাকাতুশ শাফিঈয়া আল কুবরা, ৪/৩৫)

৬. শায়খ ইয়াহইয়া ইবনে আহমাদ আল আনসারি (রহ.) কোরআন হিফজের নিয়তে জমজম পান করেন। ফলে তিনি খুবই স্বল্প মেয়াদে কোরআন হিফজ করতে সক্ষম হন।

৭. হাকিম আবু আবদুল্লাহ (রহ.) জমজম পান করেন উৎকৃষ্ট রচনা সংকলনের নিয়তে। ফলে তিনি ছিলেন স্বীয় যুগের সবচেয়ে ভালো মানের লেখক ও সংকলক। (ফাতহুল কাদির, ২/৩৯৮-৪০০)

কখনও আলেমগণ অন্যান্য বড় বড় উদ্দেশ্য সামনে রেখে জমজম পান করতেন।

যেমন: ১. হাফিজ ইবনে হাজার (রহ.) বর্ণনা করেন, ইমাম শাফিয়ি (রহ.) তীর নিক্ষেপে পারদর্শিতা অর্জনের নিয়তে জমজম পান করেন। ফলে প্রতি দশটি তীরের নয়টিই তিনি লক্ষস্থলে পৌঁছিয়ে দিতে পারতেন। (ফায়জুল কাদির, ২/৫০৭)

২. হাফিজ সাখাওয়ি (রহ.) ইবনুল জাযারি (রহ.)-এর জীবনালোচনায় লিখেন, তার পিতা ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। চল্লিশ বছর পর্যন্ত কোনো সন্তান লাভ করেন নি। এরপর তিনি হজে গেলেন এবং পূণ্যবান সন্তান পাওয়ার নিয়তে জমজম পান করলেন। পরে একরাত সালাতুত তারাবিহের পর মুহাম্মাদ আল জাযারির জন্ম হয়। আর জ্ঞান-গরিমায়, বিশেষত কেরাত শাস্ত্রে ইবনুল জাযারি (রহ.)-এর যে শীর্ষ অবস্থান ছিল- তা তো বিজ্ঞজনের জানাই আছে। (আল গায়াহ, ১/৫৮)

৩. কোনো কোনো আলেমের ব্যাপারে বর্ণনা পাওয়া যায় যে, যখন তিনি জমজম পান করলেন, দোয়া করলেন, ইয়া আল্লাহ! আপনার নবী আমাদের বলে গেছেন ‘জমজমের পানি যে নিয়তে পান করা হয় অর্থাৎ তাই কবুল হয়। ‘ ইয়া আল্লাহ! আমি এই জমজম পান করছি যেন কিয়ামত দিবসে তৃষ্ণার্ত না হই। (আখবারু মক্কা, ২/৩২)। সূত্র: কা: ক:

ফেসবুক মন্তব্য
xxx