এনআরবিসি ব্যাংকের ৭০১ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ।

সিলনিউজটুয়েন্টিফোরডটকম ::: ক্ষমতার অপব্যবহার করে ৭০১ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেন নতুন প্রজন্মের এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। পরিদর্শনে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার পর তাদের দুর্নীতির দায়ে পদ থেকে কেন অপসারণ করা হবে না, তা জানতে চেয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই নোটিশের জবাব পাঠিয়েছেন চেয়ারম্যান ও এমডি। এখন তাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে শুনানির জন্য গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের স্থায়ী কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে ঘটনার সারসংক্ষেপ। ওই সারসংক্ষেপ বিশ্লেষণ করে চেয়ারম্যান ও এমডিকে ব্যক্তিগত শুনানিতে ডাকতে পারে স্থায়ী কমিটি। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়গুলো উল্লেখ করে গত ২০ মার্চ চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার ফরাসৎ আলী এবং এমডি দেওয়ান মুজিবুর রহমানকে কারণ দর্শানো নোটিশ পাঠায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ। ১০ দিনের মধ্যে এর জবাব দিতে বলা হয়। ব্যাংকের চেয়ারম্যানকে দেওয়া নোটিশে সুনির্দিষ্ট কোনো ধারা উল্লেখ করা হয়নি। তবে এমডিকে ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৬ ধারায় নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এই ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে যে কোনো ব্যাংকের চেয়ারম্যান, পরিচালক বা এমডিকে অপসারণ করতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে বেসিক ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংকের এমডিকে অপসারণের আগে ৪৬ ধারায় নোটিশ দেওয়া হয়েছিল।

সূত্র জানায়, কারণ দর্শানো নোটিশের উত্তর পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দুর্নীতি ও তাদের জবাবের সারসংক্ষেপ স্থায়ী কমিটিতে পাঠায়। স্থায়ী কমিটি সারসংক্ষেপ পাওয়ার পর অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত শুনানিতে ডাকে। এর পর তাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেলেও এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের বিষয়ে সারসংক্ষেপ স্থায়ী কমিটিতে পাঠায়নি ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ। কয়েক দিন আগে অর্থমন্ত্রী এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে গভর্নরের কাছে সারসংক্ষেপ পাঠান।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল এ বিষয়ে সারসংক্ষেপ ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে স্থায়ী কমিটির কাছে পাঠানো হয়। স্থায়ী কমিটির প্রধান হচ্ছেন ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান। অন্য সদস্যরা হলেন নির্বাহী পরিচালক আহমেদ জামাল ও মিজানুর রহমান জোদ্দার এবং সদস্য সচিব ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের মহাব্যবস্থাপক আবু ফারাহ মো. নাসের।

নিয়ম অনুযায়ী স্থায়ী কমিটি শুনানির জন্য চেয়ারম্যান ও এমডিকে ডাকতে পারে। এর পর তাদের জবাবে সন্তুষ্ট না হলে আইন অনুযায়ী অপসারণের জন্য সুপারিশ করে গভর্নরের কাছে পাঠাবে। গভর্নর অনুমোদন করলে তারা অপসারিত হবেন। ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৮ ধারায় বলা হয়েছে, ৪৬ ও ৪৭ ধারা অনুসারে গভর্নর ছাড়া অন্য কেউ চেয়ারম্যান ও এমডির অপসারণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন না। তবে এ উদ্দেশে গঠিত স্থায়ী কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে গভর্নর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। আমানতকারীদের স্বার্থরক্ষায় পর্ষদ ব্যর্থ প্রমাণিত হলে ওই ধারা অনুসারে পরিচালনা পর্ষদও ভেঙে দিতে পারেন গভর্নর।

এ বিষয়ে ইঞ্জিনিয়ার ফরাসৎ আলী বলেন, সঠিকভাবে আমরা ব্যাংক পরিচালনা করে আসছি। আমাদের বিরুদ্ধে আনা বিভ্রান্তিমূলক অভিযোগের বিষয়ে আদালতে মামলা চলছে। এখন যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আমাদের ডাকা হয়, তা হলে বিষয়টি সুস্পষ্ট করে তাদের কাছে উপস্থাপন করা হবে।

উল্লেখ্য, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার ফরাসৎ আলীর কাছে পাঠানো বাংলাদেশ ব্যাংকের নোটিশে উল্লেখ করা হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে ব্যাংকের করপোরেট গভর্ন্যান্স তথা ব্যাংক পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, বিধিবহির্ভূতভাবে ঋণ অনুমোদন ও বিতরণের সঙ্গে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে, যা ব্যাংক এবং আমানতকারীর স্বার্থের পরিপন্থী। বিশেষ পরিদর্শনে পাওয়া বিভিন্ন অনিয়ম পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়, আমানতকারীর স্বার্থরক্ষায় পরিচালনা পর্ষদ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে।

নোটিশে আরও উল্লেখ করা হয় পরিচালনা পর্ষদের সদস্য না হয়েও মার্কেন্টাইল ব্যাংকের চেয়ারম্যান শহীদুল আহসান এবং তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান আহসান গ্রুপের কর্মকর্তা এনআরবিসি ব্যাংকের বিভিন্ন পর্ষদ সভায় উপস্থিত থাকার বিষয়টি পরিদর্শনে পরিলক্ষিত হয়েছে। আহসান গ্রুপের পরিচালক ও আবদুল মান্নানের বিকল্প পরিচালক সৈয়দ গোলাম ফারুক বিকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগেই পর্ষদের চারটি সভায় উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া শহীদুল আহসানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট এজি অ্যাগ্রোকে প্রিন্সিপাল শাখা থেকে ১৮৩ কোটি টাকা এবং চন্দ্রগঞ্জ শাখা থেকে বেগমগঞ্জ ফিডের নামে সৃষ্টি ঋণসহ ৩০১ কোটি টাকার ঋণে নানা অনিয়ম হয়েছে। নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ধানমণ্ডি শাখার খেলাপি গ্রাহক গোল্ডেন স্টার ইন্ডাস্ট্রিজকে ঋণ প্রদান ছিল বেআইনি। এ ছাড়া এক্সিম ব্যাংকের গ্রাহক প্রতিষ্ঠান ফার্স্ট করপোরেশনের ৮ কোটি ৭৭ লাখ টাকার ঋণ অধিগ্রহণসহ প্রতিষ্ঠানটিকে ২০ কোটি টাকার ঋণ, ব্যাংকের পরিচালক সৈয়দ মুনসেফ আলীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান মাল্টিপ্ল্যান ডেভেলপমেন্টকে দেওয়া ঋণ ডাউনপেমেন্ট ছাড়াই এমডির একক ক্ষমতায় ঋণের মেয়াদ বৃদ্ধি, বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সাতলা ইউনয়নে একটি অ্যাগ্রো ফিশারিজ প্রকল্পের ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার আবেদনসহ বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সূত্র: আমাদের সময়

Facebook Comments