সুবিধাবঞ্চিত পথশিশু ও আমাদের করণীয়।

 

পথশিশু। সমাজের অবহেলিত এক স্তর। অবহেলা, লাঞ্চনা যাদের নামের সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে তারাই পথশিশু। শৈশবকালে যেখানে আদর-স্নেহ পেয়ে বড় হওয়ার কথা ওদের সেখানে ওদেরকে প্রতিনিয়ত সহ্য করতে বঞ্চনা। শিকার হতে হয় লাঞ্চনার। দু-চার টাকার জন্য পথচারিদের কাছে কত ভাবেই না ওরা অনুনয় বিনয় করে। ওদের মাথার উপর না আছে একটু খানি মমতার উষ্ণ শীতল ছায়া, না আছে রাতে শান্তিতে ঘুমানোর নিরাপদ আশ্রয়। শীতের রাত্রীতে আমরা, আপনারা অর্থাৎ তথাকথিত সুশীলরা যেখানে হাজার টাকার শীতের কাপড় পড়ে ঘুমানোর আগে কয়েক কেজি ওজনের কম্বল গায়ে না জড়ালে আমাদের শীতে ঘুমই আসে না, সেখানে ওরা কম্বল-তোষকতো দূরে থাক, কোনপ্রকার গরম কাপড় ছাড়াই রাত্রীযাপন করে। যা অত্যন্ত অমানবিক দুঃখজনক।

আমরা যদি উন্নত বিশ্বের অন্যন্য দেশগুলোর দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাবো ওরা পথশিশুদের অন্যান্য সকল নাগরিকের মতোই সমান গুরুত্ব প্রদান করে। বিশেষ করে সকল মৌলিক চাহিদাগুলো পুরন করার পরে সুবিধাবঞ্চিত এসব শিশুদের পূনর্বাসন এর ব্যবস্থা করে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে। পিছিয়ে পড়া এসব শিশুদের মৌলিক অধিকারগুলো আদায়ে তারা খুবই সচেতন ভূমিকা রাখে। অন্যান্য দশজনের মতই ওদের সকল প্রকার নাগরিক সুযোগসুবিধা প্রদান করা হয়।

সকল স্বাধীন দেশের নাগরিকদের ৫টি মৌলিক অধিকার থাকে। অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থান। সরকারের দায়িত্ব হলো সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করা। যেহেতু, পথশিশুরা জন্মসূত্র অনুসারে এদেশের নাগরিক সেহেতু, এদের প্রতি অবশ্যকরণীয় দায়িত্ব সরকার এড়িয়ে যেতে পারে না।

বিভিন্ন প্রাপ্ত সূত্র হতে জানা যায় বাংলাদেশে ১০লাখেরও বেশী পথশিশু রয়েছে। এবং দুঃখজনক হলেও সত্য, এই সংখ্যাটি দিনদিন অাশংকাজনক হারে বাড়ছে।

সিলেটে পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা একটি সংগঠন, ‘ফ্রেন্ডস পাওয়ার ইউনাইটেড ক্লাব’এর সাম্প্রতিক গবেষণায় যেসকল তথ্য পাওয়া যায় তা শুনলে রীতিমত গা শিউরে ওঠে।

সংগঠনটির ভাষ্যনুযায়ী, সিলেটে প্রায় ৪ হাজারেরও বেশী ভাসমান পথশিশু রয়েছে এবং এদের মধ্যে প্রায় ৭০ ভাগের ও বেশী শিশু নেশাদ্রব্য সেবন করে। এরা দিনে ভিক্ষা করে, রাতে চুরি-ছিনতাইসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধকর্ম করে বেড়ায়। এদের বেশীরভাগের বয়স ৮-১২ বছরের মধ্য সীমাবদ্ধ। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো কিছু অর্থলোভী পিশাচ শ্রেণির মানুষ এদেরকে অস্ত্র, মাদকদ্রব্যের বাহন হিসেবে ব্যাবহার করে। কারন, শিশুদের দিয়ে এসব কাজ করানো অনেকটাই নিরাপদ। পুলিশের চোখঁ ফাকি দিয়ে এসব কাজ অতি সহজেই সম্পাদন করা যায় শিশুদের দিয়ে। অবুঝ এই শিশুগুলো জানতেও পারে না ওরা কত ভয়ংকর রাস্তায় বিচরণ করছে। মাদকদ্রব্য তাদের জন্য সহজলভ্য হওয়ায় খুব অল্প বয়স থেকেই ওরে বিভিন্ন প্রকার নেশায় আশক্ত হয়ে পড়ে। গাজাঁ, ইয়াবার অতিরিক্ত সেবনের ফলে ওরা ধিরে ধিরে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ে। দেশের মেধা, ভবিষ্যতগুলো এভাবেই অংক্ষুরে বিনষ্ট হয়ে পড়ে। এই যে এই শিশুরা এত অল্প বয়সে অপরাধ জগতে পা রাখছে ওরা যখন একটু বড় হবে তখন কি হবে ভেবেছেন একবার। ওরা যখন শিশুকাল থেকে যৌবনকালে পা রাখবে তখন এরা কতটুকু ভয়ংকর অপরাধী হিসেবে রুপধারন করবে তা আমার আপনাদের কল্পনার বাইরে।

এসব পথশিশুরা তাদের মৌলিক সুবিধাদি হতে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি তারা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকেও বঞ্চিত। এরা অনেকেই বিভিন্ন হোটেল-রেষ্টুরেন্ট সহ বিভিন্ন ব্যবসায়ীক প্রতিষ্টানে শ্রম দেয়। সারাদিন অমানুষিক কাজ করার পরে তাদের হাতে ৫০-৬০ টাকা ধরিয়ে দেওয়া হয়। বিষয়টা একবার ভেবে দেখুন, একটি ছোট্ট শিশু সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কমপক্ষে ১০-১২ ঘন্টা হাড়ভাংগা খাটুনি খেটে মজুরি পায় ৫০ টাকা। এ কটা টাকাই কি ওদের জীবন ধারনের জন্য যথেষ্ট? তার ওপর রয়েছে দোকান মালিকের চরম দূর্ব্যবহার ও শারিরিক নির্যাতন। একটা বাচ্চা ছেলেকে নির্যাতন করতে উনাদের বিবেকে বাধে না। কারন দেখার কেউ নেই, ওর পরিচয় ও একটা পথশিশু।

আমরা বাংগালী। আমাদের প্রধান সমস্যা হলো আমরা সমস্যার মূল না উপড়ে ডালপালা কেটে দিয়ে সমস্যাগুলো ধামাচাপা দিয়ে রাখার চেষ্ঠা করি। কিন্তু একবারও এটা ভাবি না যে, কোনকিছুই বেশীদিন ধামাচাপা দেওয়া যায় না। আমরা রাস্তাঘাটে এসব শিশুরা ভিক্ষার জন্য আসলে ওদের হাতে দু-চার টাকা দিয়ে বিদেয় করি। একবার ও চিন্তা করি না, ওরা কেনো আজ পথশিশু, ওরা কেনো ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নিয়েছে। যে বয়সে ওদের পড়ার টেবিলে থাকার কথা সেই বয়সে ওরা দু’টাকা ভিক্ষার জন্য মানুষের ধারে ধারে ঘুরে বেড়ায়। ওরা কি স্বেচ্ছায় এই পেশায় নেমেছে? না, ওরা স্বেচ্ছায় নয় বরং বাধ্য হয়ে এই পেশায় নেমেছে।

উপরোল্লিখিত সংগঠনটির কাছ থেকে আরো জানা যায়, এই সব শিশুরা হয় পিতৃহারা অথবা জন্মের পরেই বাবা ওদের ছেড়ে অন্য নারীর সাথে চলে গেছে। পিতৃপরিচয়হীন শিশুর সংখ্যা নেহাত কম নয়। এরা কার কাছে যাবে, কোথায় যাবে। কোন আশ্রয় না পেয়ে ওরা ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নেয়। এর পরে নেশাগ্রস্থ এবং আরো পরে ওরা হয়ে ওঠে ভয়ংকর অপরাধী। ওদেরকে কি এই ভিক্ষাবৃত্তি হতে নিভূত করা যায় না? হ্যা, অবশ্যই যায়। ওদের মমতার চাদরে মুড়ে ধিরে ধিরে পূনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

শিশুরাই জাতীর আগামী দিনের ভবিষ্যত। পথশিশু নামক এই বিশাল মানবসম্পদের সমুদ্রকে বাদ দিয়ে দেশের অগ্রযাত্রা কখনোই সম্ভবপর নয়। সরকারের উচিৎ, এই পথশিশুদের অধিকার সংরক্ষনে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রনয়ণ এবং তা কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা। যার ফলে প্রত্যেক শিশুর সকল মৌলিক অধিকার যেনো সংরক্ষিত থাকে। তানাহলে, ওদের মধ্য যে অপরাধপ্রবণতা রয়েছে তা ক্রমেই বাড়বে।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, ওরাও দেশের সম্পদ। ডিজিটাল বাংলাদেশের যে স্বপ্ন আমরা দেখি তা এইসব শিশুদের উপযুক্ত মূল্যায়ন ব্যতিত অসম্ভব। সরকারের একার পক্ষে সব কিছু করা সম্ভব নয়। আমাদের দেশে সমাজ উন্নয়নমূলক বিভিন্ন সংগঠন রয়েছে। ওরা ওদের সাধ্যানুযায়ী নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। ওদের একার পক্ষেও সবকিছু সম্ভব নয়। সমাজের বিত্তবানদের উচিৎ, ওদের পাশে দাড়িয়ে ওদের দিকে সাহায্যর হাত বাড়িয়ে দেওয়া।

লেখক: ফাহাদ আহমেদ

বি.বি.এস (১ম বর্ষ), মদন মোহন কলেজ।

১৭ জুন ২০১৭

সিলনিউজটুয়েন্টিফোরডটকম/অ/লে/১৭জুন

Facebook Comments