গল্পঃ প্রতীক্ষারত অর্পিতা – – – – ইকবাল এইচকে খোকন

গল্পঃ প্রতীক্ষারত অর্পিতা

——————ইকবাল এইচকে খোকন

তিন মাস হয়ে গেল কোন খোঁজ নেই অনিকের। পথপানে মগ্নধ্যানে প্রতীক্ষারত অর্পিতা। এই বুঝি এলো অনিক! পেছন থেকে এসেই বলবে লাড্ডুর মা আমি এসে গেছি। “লাড্ডুর মা” নামটি অনিকেরই দেওয়া, ভালোবাসার চূড়ান্ত পাগলামির বহিঃপ্রকাশ স্বরূপ। কল্পনাটা কল্পনাতেই থেকে যায় অর্পিতার, বাস্তব হয়না। তবুও অপেক্ষার অষ্টপাশে আটকে থাকে অর্পিতা। প্রচণ্ড বিশ্বাস তার, অনিক আসবেই ভালোবাসার শক্তিমান পবন হয়ে। শ্রেষ্ঠ প্রেমের ছাদরে ক্লান্তিহীন পরশে অকৃক্রিম স্বর্গসুখে জড়াবেই। প্রতিটি প্রহর কাটে আনমনা হয়ে চাতক পাখির মতো প্রতীক্ষার বদ্ধঘরে। আর সান্ত্বনা গুনে “এই বুঝি এলো অনিক” ভেবে।

নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করে অর্পিতা, আচ্ছা! অনিক সত্যি আসবেতো? না না ও না এসে পারেনা, অনিক আসবেই।

এভাবেই পার হয়ে যাচ্ছে দিনগুলি। মাঝে মধ্যে অভিমানে থমকে থাকে অর্পিতা। আসুক অনিক! আমাকে কষ্ট দেওয়ার শাস্তি ওকে দেবো ভালো করে।

তিক্ততায় অনেক সময় ভাবে অর্পিতা, আচ্ছা, বিশাল অট্টালিকার কঠিন দেয়ালের ভেতরে আমার নামটি কি একবারও মনে পড়েনা অনিকের? আলিশান বাড়ি গাড়ি আধুনিকতার সর্বপুরি রাজ্যে প্রচণ্ড উচ্ছ্বাসের মধ্যে আমার কথা ভুলে যায়নিতো অনিক? পশ্চিমা কালচারে বেড়ে উঠা অনিক পশ্চিমাদের মতোই পোশাক পাল্টানোর খেলায় মানুষের মন বা ভালবাসাকেও পাল্টায়নিতো? না না, এ আমি কি ভাবছি! অনিক এ ধরনের ছেলে নয়। ও কখনো এ কাজ করতে পারবেনা। ও আমাকে ভালোবাসে, প্রচণ্ড ভালোবাসা যাকে বলে সেই ভালোবাসাই।

আমিতো প্রথমে ভালোবাসিনি ওকে। সে-ই-তো তার ভালোবাসার প্রবল জোয়ারে আমাকে আটকে ফেলে তার স্রোতে। তার থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। প্রেমের মহাপ্লাবনে ডুবে যেথে বাধ্য হই আমি, সবই অনিকের কারনে। ওর আমার বিশাল ব্যবধানের প্রসঙ্গ যখনই ওকে মনে করিয়ে দিতাম তখন অনিক এমন সব কাণ্ড করে বসতো, যা কল্পকাহিনীকেও হার মানাতো। অনেক বুঝিয়েছি অনিককে, কিন্তু সে সিদ্ধান্তের কঠিন এক পাথর। হাজারো শপথ, হাজারো স্বপ্ন দিয়ে অনিক আমাকে এমন এক কঠিন শিকলে বেঁধে রেখেছে যা এখন আমি অগ্নিবীণার রূপ ধারন করতেও পিছ পা নই। কঠিন শপথের বাস্তব রূপরেখার চূড়ান্ত উৎসবে আমরা মেতে উঠবই, এ আমাদের প্রতিজ্ঞা। যা এখনো সূতোঁ পরিমাণ নড়চড় হয়নি।

তাইতো আজ প্রতীক্ষায় ক্লান্ত নয় অর্পিতা। হোক না এ প্রতীক্ষার যুগ থেকে যুগ। অর্পিতা স্মৃতির গহীনে একবার প্রবেশ করে। অনিকের সাথে শেষ দেখার সময় অনিক বলে গিয়েছিল “আমি যাচ্ছি অর্পিতা, তবে শুধু দেহটা নিয়েই, আমার সত্ত্বা অস্তিত্ব তোমার কাছেই রেখে যাচ্ছি। আমার এ আমানত তোমার জীবন একাউন্টে দীর্ঘ মেয়াদী সঞ্চয় হিসেবে রেখে গেলাম। কোন ভুল যেন না হয় সেই হিসেবে। আমি আবার আসব। গার্জিয়ানরা তোমার আমার বিষয়টি  জেনে গেছেন। কিন্তু তাতে আমার কিছু যায় আসেনা। আমি শুধু আমার অস্তিত্তে বিশ্বাসী, কারো হস্তক্ষেপে আমার টনক নড়াতে পারবেনা। সময়কে যেথে দাও, আমি পরিপূর্ণ হতে চাই। যখন ফিরব, প্রাপ্তির সবটুকু উচ্চাস সাথে নিয়েই ফিরবো। পরাজয় বলতে আমার অবিধানে কিছু নাই। তাই আমি অপ্রতিরোধ্য, তোমাকেও সে রকম দেখতে চাই। বিদায় আজ, তবে আমি আসব, আসবো শুধু তোমার জন্য”

আশ্রুসিক্ত হয়ে উঠে অর্পিতার চোখ। মনে মনে বলে উঠে পাগল…।

এভাবেই পার হয়ে যাচ্ছে দিন মাস বছর। আজো অবিচল প্রতীক্ষারত অর্পিতা। তবে প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়ে গেছে সে। গার্জিয়ানরা উঠে পড়ে লেগেছেন বিয়ে নামক সামাজিক স্বীকৃতির সার্টিফিকেটের জন্য। অর্পিতা প্রবল বাঁধা হয়ে ধারায় এ স্বীকৃতির বিরুদ্ধে। তার একটাই সিদ্ধান্ত, অনিকের সাথে যৌথ স্বর্গ অথবা নরকমুখ সে। আর দ্বিতীয় কোন সিদ্ধান্ত নেই তার। দিনের পর দিন প্রবল বাঁধা সত্ত্বেও যেন জয়ী হতে পারেনা অর্পিতা। হাজারো পেশীশক্তির উচ্চ কণ্ঠস্বরের কাছে খুবই ম্লান হয়ে পড়ে তার একা নারী কণ্ঠ। হাজারো বাঁধায় এক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে অর্পিতা, আর পারেনা। চারিদিকে সবার সমবেদনাটাও তার বিপক্ষে। সাথী শুধু নিজেরই দুচোখের ক’ফোটা নোনা জল। দিন রাত প্রতিটি প্রহর অর্পিতার সঙ্গী হয় দুচোখের অশ্রু ও নীল স্মৃতিগুলো।

বছর হয়ে গেলো কোন খোঁজ নেই অনিকের। শেষ চেষ্টা করে অর্পিতা জানতে পারে অনিক অনেকদিন হলো আছে আমেরিকায়। তাও যোগাযোগ নাই বাবা মার সাথে, কেউই জানেনা অনিকের খোঁজ। কোথায় আছে কেমন আছে তাও অজানা।

অর্পিতা কাঁদে। মনে মনে বলে, অনিক তুমি কি নিজ থেকেই ভুলে গেলে সব? নাকি তার বিপরীত? এদিকে আমি যে তোমার আমানত রক্ষায় ভীষণ অসহায় ও অক্ষম হয়ে পড়েছি। আমি আর পারছিনা এ শপথ টানতে। খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে আমার পৃথিবী, আপন সত্ত্বা বলতে কিছুই অবশিষ্ট থাকছেনা আমার। তবে কি আমরা হতে চলেছি দুইমেরুর বাসিন্দা দুইজন? তোমাকে আজ খুব প্রয়োজন অনিক। কিন্তু আমার এই অসহায় আত্মচিৎকারতো পৃথিবীর ঐ প্রান্তে তোমার কাছে গিয়ে পৌঁছাবেনা ! এখন তুমি বলে দাও আমি কি করব। আলোকদীপ্ত কঠিন শপথ ভাঙ্গবো নাকি লাইলি জুলিয়েটদের পথ অনুসরণ করবো ?

লেখক:

সম্পাদক

সিলনিউজ২৪.কম

১৭ মে ২০১৭

Facebook Comments