প্রথম বিদেশ ভ্রমণ : হেনা আহমেদ

জীবনের প্রথম দেশের বাইরে কোথাও যাওয়ার আলাদা এক অনুভুতি ছিলো বলে রাতে যেনো ঘুমটা লাগছিলনা। কারন খুব ভোরে রওয়ানা দেবো আমরা। আমরা মানে আমি আমার হাজবেন্ড আর ছেলে।

২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাস ছিলো, বাসায় তেমন একটা ঠান্ডা না লাগলেও গাড়িতে ঠান্ডা লাগছিল। তামাবিল বর্ডারে যখন পৌছলাম তখন সকাল সারে সাতটা। বর্ডারে ইমিগ্রেশন শেষ করে যখন ইন্ডিয়া প্রবেশ করলাম তখন সকাল প্রায় নয়টা বাজে। নিজের দেশকে কত ভালোবাসি তা বুঝেছিলাম সেদিনই। যখন পা রাখলাম ইন্ডিয়ার মাটিতে তখন ভেতরটা কেনো জানি হু হু করে কেঁদে উঠলো, শুধু পেছন ফিরে দেখি আমার প্রিয় দেশকে। সাড়ে নয়টার সময় আমরা ডাউকি বর্ডার ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ করলাম। ইমিগ্রেশন অফিসের সামন থেকেই একটা গাড়ি ঠিক করে রওয়ানা দিলাম শিলং এর উদ্দেশ্যে। গাড়ি যতই এগিয়ে যাচ্ছে আমরা ততই উপরে উঠছি। জাফলং বেড়াতে গিয়ে যে ঝুলন্ত ব্রিজ নিয়ে ছবি তুলতাম আমরা, সেই ব্রিজটা যখন ক্রস করলাম তখন নিচের দিকে তাকিয়ে দেখলাম মানুষগুলোকে ঠিক পাখির মতোই লাগছিলো। তারপর শিলংয়ের জিকজ্যাক পথ ধরে এগুচ্ছি। চারিদিকে বড় বড় পাথরে পাহাড় দেখছি অবাক হয়ে। একেকটা বিশাল বিশাল পাথর একেকটা রুমের সমান হবে।

শিলং হয়ে দীর্ঘ কয়েক ঘন্টা টেক্সি জার্নি শেষে গুয়াহাটি পৌছলাম। তারপর ফ্রেশ হয়ে লাঞ্চ করলাম একটা রেস্টুরেন্টে। গুয়াহাটি রেল স্টেশন পৌছে টিকেট কেটে উঠে গেলাম জলপাইগুড়িগামী ট্রেনে। ট্রেনের স্প্রিড এবং ভেতরের পরিবেশটা অনেক ভালো, সেই সাথে গতিও ছিলো বেশ। ট্রেন জার্নিটা আমার অনেক ভালো লাগে, তাই জানালায় বসে পেছনে ফেলে আসা বাড়িঘর দেখতে ভালো লাগছিল। কিন্তু শীত এবং রাত হয়ে যাওয়ায় সেটা আর বেশি উপভোগের সুযোগ হয়নি। প্রায় দশ ঘন্টা ট্রেন জার্নি করে যখন আমরা জলপাইগুড়ি নামলাম তখন খু্ব ভোর। কিছু সময়ের মধ্যেই জলপাইগুড়ি থেকে গাড়ি নিয়ে চলে গেলাম রানীগঞ্জ ভারতীয় ইমিগ্রেশনে। সেখানে ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ করে ঢুকলাম নেপাল। পরিচিত এক ভাই এসে নিয়ে গেলেন তার হোটেলে। হোটেলের নাম ঢাকা হোটেল, নেপালের সীমান্ত শহর কাকড়ভিটাতে। রুমে গিয়ে ফ্রেশ হলাম। পুরো ছাব্বিশ ঘন্টা জার্নি শেষ করে ক্লান্ত। একদিকে বিছানায় যেতে মন চায় অন্যদিকে বাইরে বেড়ানোর লোভও হচ্ছে। যাই হোক স্বামী বেচারা রুমে ডুকেই ঘুম দিয়ে দিলেন আর আমি আর আমার ছেলে রুমের ভেতরই সেলফি তোলায় ব্যস্ত, কারন অপরিচিত জায়গায় চাইলেইতো বাইরে বেরুনো যাবে না, তাই মা বেটা রুমেই সান্তনার ছবি তুলছিলাম। তারপর দুপুর একটায় বের হলাম রুম থেকে। রেষ্টুরেন্টে খেয়ে গাড়ি নিয়ে কিছু দর্শনিয় স্থান দেখতে গেলাম। ঘরে বসে টিভিতে আর গুগল সার্চ করে দেখা আর প্র্যাক্টিক্যাল দেখার মাঝে অনেক পার্থক্য আছে বুঝলাম। চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায়না আল্লাহর পৃথিবী কত সুন্দর।ভ্রমন সবার জীবনেই দরকার, হোক সেটা দেশে বা দেশের বাইরে।

রাতে চলে গেলাম শপিংয়ে। প্রত্যেকটা শপে মেয়েদের দেখে মনে হলো আমাদের দেশ এদিক থেকে পিছিয়ে। আমাদের দেশে মেয়েরা দোকানে বসলে কত মানুষ কত কথা বলে। এখন অবশ্য আগের চেয়ে কিছু উন্নতি হয়েছে, মেয়েরাও সমানতালে না হলেও অনেকে জায়গাতেই জব করছে।

পরদিন কাঠমুন্ডু যাবার কথা কিন্তু ছেলের শরীরটা বেশি ভাল না থাকায় পরদিন বিকেলে রওয়ানা হলাম আবার ইন্ডিয়া। এবার ইন্ডিয়াতে বেড়াবো। প্রথম শিলিগুড়ি এসে শপিং করে ট্রেন ধরলাম গুয়াহাটি আসার জন্য। গুয়াহাটি পৌছে হোটেলে উঠলাম। পরে বের হলাম আসামের মন্দির, দিঘলীপুকুরিয়া পার্ক দেখতে। দিঘলীপুকুরিয়া নামের পার্কটি ভীষন বড় ও সুন্দর। বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে মনটা চাঙ্গা হয়ে উঠলো। সন্ধ্যার পর মার্কেটে গেলাম। সেদিন রাতে গুয়াহাটিতেই অবস্থান করলাম। পরদিন দুপুরে শিলং রওয়ানা দেই। শিলং অনেক ঠান্ডা ছিলো। শিলংয়ে করিমগঞ্জের কিছু রেষ্টুরেন্ট আছে, সেখানে গরুর মাংস ডাল দিয়ে পেট ভরে খেলাম। কারন খাবার দাবাড়ে কিছু সমস্যা ইন্ডিয়াতে হয়। ভীন দেশ বলে কথা। তাই সবকিছু নিজের দেশের মতো করে ভাবলেতো চলবেনা! এর আগে নেপাল খেয়েছিলাম একবার, ঢাকাইয়া ঐ ভাই নিজে তার বাসায় মুরগির মাংস, আলুভর্তা, ডাল রান্না করে খাইয়েছিল আমাদের। শান্তিমতো স্বদেশী খাবার বলতে অইটুকুই পাতে পড়েছিল। যাই হোক, শিলং পার্কসহ আরো কয়েকটি জায়গায় বেড়ালাম দুদিন। তারপর আবার নিজের মাতৃভূমিতে ফিরে আসার পালা। ফিরে আসার সময়ও কেনো জানিনা খারাপ লাগছিলো।

Facebook Comments