মালয়েশিয়া ভ্রমণ ও কিছু স্মৃতি: ইকবাল এইচকে খোকন

এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে যে কয়টি দেশ দ্রুত উন্নতি করেছে তার মধ্যে মালয়েশিয়া অন্যতম। আশির দশকে খুব দ্রুতই দেশটি উন্নতি করেছে। অাধুনিক মালয়েশিয়ার জনক যাকে বলা হয় তিনি ড. মাহাতির মোহাম্মদ। যার সম্পর্কে বলে শেষ করার মতো নয় এবং পৃথিবীর কোন মানুষের কাছেই তিনি অপরিচিত নন। দীর্ঘ ২৭ বছরে তিনি তীলে তীলে জন্ম দিয়েছেন আধুনিক মালয়েশিয়ার। সবার মতো অামার ও অগাদ শ্রদ্ধা ড. মাহাতির মোহাম্মদের প্রতি। দেশপ্রেম এবং দেশের জন্য কি করা যায় তা দেখিয়ে দিয়ে গেছেন ড. মাহাতির। ছোট বেলা থেকেই শুনে আসছি এই মহান মানুষটির কথা এবং তার গড়া অাধুনিক মালয়েশিয়ার কথা। তাই দেশটি দেখার ইচ্ছাটা লালন করে রেখেছি অনেক বছর পূর্ব থেকেই। ২০১৬ সালে সেই ইচ্ছেটাকে বাস্তবে রুপ দিয়েছিলাম। সেই কথাগুলোই ভ্রমণ কাহিনীতে তুলে ধরার চেষ্টা করব।

অক্টোবর ২০১৫ তে মনস্থির করলাম মালয়েশিয়া বেড়াতে যাবো ফাইনালি। কিন্তু সাথে যাওয়ার জন্য কাউকে পাচ্ছিলাম না। অবশেষে স্কুল বন্ধু মুজাম্মেল হক মাছুম অাগ্রহ প্রকাশ করল মালয়েশিয়া যাওয়ার। তাকে পেয়ে মনের মধ্যে একটা স্প্রিড চলে এলো এবং শুরু করলাম ডকুমেন্টস তৈরি করার কাজ। তারপর অক্টোবর ২০১৫ মাঝামাঝি সময়ে দুজনের পাসপোর্ট ও ডকুমেন্টস জমা দিলাম অারেক বন্ধু দানিয়েল হাসানের কাছে। দুই সপ্তাহ পর পাসপোর্ট হাতে অাসলো। শুরুতেই হুছুট খেলাম। কারন অামি মালয়েশিয়ার ভিসা পেলেও বন্ধুটি ভিসা পায়নি। হতাশায় পেয়ে বসলো কিন্তু হাল ছাড়িনি। অাবারো নতুন করে মালয়েশিয়ার ভিসার জন্য তার ফাইল জমা দিলাম। প্রথমবার ভিসা না দেওয়ার অপশনগুলো নিজেরাই খুঁজতে লাগলাম এবং সাধ্যমতো সব ভুল ত্রুটি ঠিক করে ফাইল জমা দিলাম ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে। কিন্তু পুনরায় হতাশ হলাম দুই সপ্তাহ পর। এবারও রিফিউজ করছে ভিসা দেয়নি। ঢাকাস্থ মালয়েশিয়ান হাইকমিশন থেকে ভিসা আবেদন রিফিউজ করার কোন কারন উল্লেখ্য করেনা। সমস্যাটা এখানেই। বুঝা যায়না ঠিক কোন কারনে ভিসা আবেদন রিফিউজ করেছে। তাই অজানাই থেকে গেল বন্ধুটির ভিসা না হওয়ার রহস্যটা। হতাশাটা চরম অাকার ধারন করলো, সুন্দর সাজানো গোছানো প্ল্যানের মধ্যে যেনো হঠাৎই সুনামির আঘাত। সব অাগ্রহের মাঝে যেনো ভাটার টান পড়লো। শেষ পর্যন্ত হয়তো একাই যেথে হবে মালয়েশিয়া। একা কোথাও যাওয়ার চেয়ে বাসায় বসে চিনাবাদাম চিবানু অনেক ভালো। এভাবে কেটে গেলো আরো কিছুদিন। খোঁজ লাগালাম পরিচিত কাউকে পাওয়া যায় কিনা মালায়েশিয়া যাওয়ার জন্য। ট্রাভেলসের বন্ধুটিও খুঁজতে লাগলো মালয়েশিয়াগামী কাউকে পায় কিনা। জানুয়ারী ২০১৬ প্রথম সপ্তাহে আমার এক কাজিন জানতে পারল অামি মালয়েশিয়া যাচ্ছি। সেটা শুনে সে জানালো তার এক ফ্রেন্ডও কাউকে পাচ্ছেনা বলে একা মালয়েশিয়া যাচ্ছেনা। কিছুটা স্বস্থি ফিরে পেলাম। মনে হলো মরুর বুকে এক পশলা বৃষ্টির অাগমন। অামার কাজিন দ্রুতই যোগাযোগ করিয়ে দিল তার ফ্রেন্ডের সাথে। তারপর দুইজনের সম্মতিতে যাওয়ার তারিখ ফিক্সড করলাম এবং টিকেট কনফার্ম করলাম। জানুয়ারীর ১৭ তারিখে ঢাকা থেকে রাত ১১ টায় ফ্লাইট ইউনাইটেড এয়ারে। তারপর মালয়েশিয়া যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু। ১২ জানুয়ারী খবর পেলাম কুয়ালালামপুরগামী ইউনাইটেড এয়ার তাদের ১৪ এবং ১৭ই জানুয়ারীর ফ্লাইট দুটি বাতিল করেছে অনিবার্য কারন দেখিয়ে। পড়ে গেলাম গ্যাঁড়াকলে। কবে অাবার ফ্লাইট চালু করবে সেটা বলতে পারছেনা কর্তৃপক্ষ। ফেব্রুয়ারীর ২ তারিখে শেষ হয়ে যাবে অামার ভিসার মেয়াদ। মনে উকি ঝুঁকি মারতে শুরু করল হতাশা। কারন এর আগে যতবার দেশের বাইরে গেছি প্রতিবারই কোন না কোন প্রবলেমে পড়তে হয়েছে অামাকে। এটা যেনো নিয়তি আমার বেলায়। তাই শেষ পর্যন্ত মালয়েশিয়া ভ্রমণ করতে পারবো কিনা সেই টেনশন ঘুরপাক খেতে লাগল মনে। বিরক্তির মাত্রাও বেড়ে গেল কয়েকগুণ। সব প্ল্যান গুছিয়ে এনে এমন হুছুট খাবো ভাবিনি। ইউনাইটেড এয়ারের ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় কুয়ালালামপুরগামী বিমানের টিকিটের সংকট দেখা দিল। ফেব্রুয়ারীর ১/২ তারিখের অাগে কোন এয়ারলাইন্সের টিকিট নাই। অনেক ঘাটাঘাটির পর ২৭ জানুয়ারীর দুটি টিকেট পাওয়া গেল। সম্ভবত কেউ টিকেট ফেরত দিয়েছে, তাই পাওয়া গেলো। সাথে সাথেই কনফার্ম করলাম। ২৭ জানুয়ারী রাত ১১:৫০ মিনিটে ঢাকা থেকে ফ্লাইট। মালয়েশিয়ান পতাকাবাহী বিমান মালিন্ডো এয়ারলাইন্স। যদিও টিকেট দুটি কিনতে হয়েছে চড়া দামে। ভাগ্যিস দাম দিয়ে হলেও অবশেষে টিকেট পেলাম। কিন্তু কোনভাবেই শান্তি পাচ্ছিলামনা। বার বার মনে সন্ধেহ জাগছিল শেষ পর্যন্ত মালয়েশিয়া যাওয়া হবেতো! সেই ভয়টা ছিল বিমানে উঠার আগ পর্যন্ত। অবশেষে সব বাধা টপকিয়ে ২৭ তারিখ সকালে ট্রেনে করে ঢাকা রওনা হলাম আমি আর রিয়াদ। রিয়াদ হচ্ছে আমার সহযাত্রী, আমার কাজিনের ফ্রেন্ড।

রাত ১২ টার দিকে ইমিগ্রেশন শেষ করে মালয়েশিয়াগামী বিমানে অারোহন করলাম। কোন ঝামেলা ছাড়াই ইমিগ্রেশন শেষ করলাম। ১২:৪০ মিনিটে যখন আমাদের বহনকারী বিমানটি রানওয়ে পথে যাচ্ছিল তখন টেনশন কাটল, সত্যি সত্যিই তাহলে যাচ্ছি। কুয়ালালামপুর সময় ভোর ৪ টার সময় নামলাম। বিমান যখন কুয়ালালামপুরের আকাশে তখনই টের পেলাম বাইরের তাপমাত্রা কি পরিমান গরম। মনিটরে দেখতে পাচ্ছি বাইরের তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রিতে অাছে। অার দেশ থেকে গেছি ১৪/১৫ ডিগ্রি তাপমাত্রা রেখে। ঠান্ডা থেকে সরাসরি চরম গরমে গিয়ে পড়তেছি বুঝলাম। যা হোক বিমান থেকে নামার পর সবাইকে সারিবদ্ধভাবে দাড় করিয়ে পাসপোর্ট চেক করা শুরু করল ইমিগ্রেশন পুলিশ। যারা প্রথমবার ভ্রমণে এসেছে এবং ওয়ার্ক পারমিট ভিসায় যারা এসেছে তাদের পাসপোর্ট এক সাথে করে নিয়ে নিল, আমাদেরটাও। শুধুমাত্র পরিবার নিয়ে যারা এসেছেন তাদের সরাসরি যেথে দিল ইমিগ্রেশনে। তারপর সবাইকে নিয়ে গেল ইমিগ্রেশন অফিসের সামনে। বাইরেই দাড় করিয়ে রাখল ইমিগ্রেশন পুলিশ পাসপোর্ট ভেতরে নিয়ে গেছে অাগেই। অামরা প্রথমবার গেছি তাই বুঝতে পারছিনা কি হচ্ছে বা করতে যাচ্ছে তারা। প্রায় ২০/২৫ মিনিট দাড়িয়ে রইলাম। কিছু সময় পর আরেক পুলিশ এসে সবাইকে মেঝেতে বসার জন্য নির্দেশ দিল। সবাই মেঝেতে বসে পড়ে। বিমানবন্দরের মেঝেতে বসতে বলছে পেসেঞ্জারকে! অবাক হলাম খুব। এ কোন ধরনের আচরণ মালয়েশিয়ান ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের? শুধুমাত্র বাংলাদেশী পাসপোর্টধারীদের সাথেই এমন ব্যবহার করছে। সবচেয়ে অবাক হলাম যখন দেখলাম সবাই কথামতো মেঝেতে বসে পড়ছে, এটা খুব স্বাভাবিকই মনে হচ্ছে তাদের কাছে। বুঝলাম সবার অভিজ্ঞতা আছে পূর্বের, তাই অনায়াসেই সবাই বসে গেছে। আবার অনেককে দেখলাম ব্যাগের সাথে হেলান দিয়ে চোঁখ বন্ধ করে ঝিমুচ্ছে। সেটা দেখে খুব অপমানবোধ করলাম। আত্মসম্মান তাহলে সবাই বিসর্জন দিয়েছে, বিষয়টাকে কোনভাবেই যেনো মেনে নিতে পারছিলামনা। ঠিক একইভাবে ট্রলার করে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় আটক মানুষদেরকে মাটির মধ্যে বসিয়ে রাখতে দেখেছি টিভিতে। আজ দেখলাম বাস্তবে, তাই বলে এয়ারপোর্টে এরকম করবে? বুঝলাম যে মালয়শিয়া উন্নত দেশ হয়েছে ঠিকই কিন্তু এদের ব্যাবহার এবং মনমানসিকতা এখনো পাম বাগানের জংলিদের মতো। ১৮০ জন প্যাসেঞ্জারের মধ্যে অামরা মাত্র ৪ জন সিলেটের। বাকিরা অন্য জেলার। তবে তাদের বেশিরভাগই নোয়াখালীর লোক বলেই মনে হলো। কথা শুনে বুঝলাম। অামি অার রিয়াদ পুলিশের কথা অগ্রাহ্য করে ভেতরে গিয়ে বসলাম। রাগ হচ্ছিল অনেক। প্রায় ৩০ মিনিট পরে প্রথমে অামার নাম ধরে ডাকল ইমিগ্রেশনে। সবকিছু দেখার পর ঝামেলা বাধাল হোটেল বুকিংয়ের কাগজ নিয়ে। মহিলা ইমিগ্রেশন অফিসার। মালয়েশিয়ার সবকিছুতে মহিলারা বেশি, পুরুষরা তুলনামূলক কম। হোটেল বুকিং তিনদিনের ছিল বলে সন্ধেহ করল। কারন অামরা গেছি ছয় দিনের জন্য। তাই এখানেই সমস্যাটা বাধিয়ে দিল। কিছুতেই মহিলা অফিসারকে বুঝাতে পারছিলাম না যে বাকি দিনগুলো এই হোটেলেই থাকব। তারপর সমস্যা দেখা দিল রিয়াদের হোটেল বুকিং বাতিল হয়ে গেছে বলে। একই হোটেল ছিল অামাদের। হোটেল বুকিং কেন বাতিল হয়েছে তার কারন অামরা জানিনা। অনলাইনে বুকিং দিয়ে কনফার্মেশন কাগজ সাথে করে নিয়ে গেছি অামরা। তাদের ধারনা অামরা বুকিং বাতিল করেছি। টানা ছয় ঘন্টা বসে থাকলাম ৩০/৩৫ জনের মতো অামরা সব বাংলাদেশি। সবাইকেই হেনস্থা করছে। আর যারা ওয়ার্ক পারমিট ভিসা নিয়ে এসেছে তাদেরকে কোম্পানির লোক এসে নিয়ে গেছে। পর পর তিনবার ইন্টাভিউ নিল। ঘুরে ফিরে সেই একই গান, হোটেল বুকিং তিনদিনের কি জন্য। বিরক্তির মাত্রা চরম আকার ধারন করল। মালয়েশিয়া অাসাটাই ভুল হয়েছে সেটা মনে হচ্ছিল বার বার। পৃথিবীর কোন সভ্য দেশে এরকম আচরণ করে বলে মনে হয়না।মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন অফিসারগুলো এতো খারাপ যা বলার মতো না। সবাইকে শুধুমাত্র বাংলাদেশি বলে অকারনে হেনস্থা করছে। অথছ ভারতীয় পাসপোর্টধারীরা সরাসরি এসে পাসপোর্ট জমা দিচ্ছে আর কোন ইন্টারভিউ ছাড়াই পাস দিয়ে দিচ্ছে। ঘটনাগুলো চোঁখের সামনেই দেখছি। স্থানীয় সময় সকাল ১১ টার দিকে আবার ডাকলো। মহিলা ইমিগ্রেশন অফিসার আমাদের পাসপোর্ট দিয়ে দিয়েছে সুনীল নামের পুরুষ অফিসারের কাছে। নাম অার চেহারা দেখে বুঝলাম ভারতীয়। তারপর সে পাসপোর্ট দেখে পাস দিল এবং বলল অামরা প্রথমবার এসেছি তাই পাস দিল, পরবর্তিতে অাসার সময় যেনো সব কাগজপত্র ঠিক করে অাসি। ইমিগ্রেশন থেকে বেরিয়ে মনে হলো যেনো রিমান্ড শেষে বেড়িয়েছি। যারা মালয়েশিয়া বেড়াতে যাবেন তারা প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র বিশেষ করে ডলার এন্ড্রোজ কপি এবং ডলার, রিটার্ন কনফার্ম এয়ার টিকেট, হোটেল বুকিং কপি মনে করে সাথে নেবেন।নইলে ঝামেলায় পড়তে পারেন।

এয়ারপোর্ট থেকে কুয়ালালামপুর যেথে পারেন টেক্সি করে, আছে বাস, ট্রেন। টেক্সিতে গেলে ভাড়া বেশি পড়বে। ১২০ থেকে ১৫০ রিংগিত পড়বে। বাসে গেলে ১০ থেকে ২০ রিংগিত এবং কেএল এক্সপ্রেস নামের স্পেশাল ট্রেন আছে, ভাড়া পড়বে ৫৫ রিংগিত। অামরা বাসে করে কুয়ালালামপুর বাস ষ্টেশন এবং সেখান থেকে টেক্সি করে জালান চৌকিট হোটেলে পৌছালাম। সময় লাগল দেড় ঘন্টার মতো। হোটেলে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে রেস্ট নিলাম। সাড়ে ১২ টার দিকে হোটেলে অাসে অামাদের এক ছোট ভাই এহিয়া অাহমেদ ওসমানী। ওসমানী তখন মালয়েশিয়া থাকতো, বর্তমানে সে কাতার অবস্থান করছে। তো ওসমানীর সাথে তখন যাওয়ার আগ থেকেই নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। সে-ই সব বলে দিয়েছিল কিভাবে কি করব না করব। সে স্টুডেন্ট ভিসায় মালয়েশিয়া গিয়েছিল। পড়াশুনার পাশাপাশি একটি রেস্টুরেন্টের ম্যানেজারের দায়িত্বে ছিল। রেস্টুরেন্টের মালিক ঢাকার এক মহিলা এবং পার্টনার পাকিস্তানি। অনেক সময় গল্প করার পর দেড়টার দিকে বের হলাম এক সাথে। লাঞ্চ করলাম বাংলাদেশী রেস্টুরেন্টে। রেস্টুরেন্টে অনেক বাংলাদেশিকে দেখে ভালো লাগল। জালান চৌকিট এলাকায় দুইটি বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট অাছে। একটির মালিক শরিয়তপুর অার অারেকটা বগুড়ার। লাঞ্চ শেষ করে হোটেলে ফিরলাম। অনেক টায়ার্ড ছিলাম তার উপর কুয়ালালামপুরের মাত্রাতিরিক্ত গরম। এহিয়া চলে গেলো তার বাসায়। সে জালান চৌকিটে থাকে। আমাদের হোটেল থেকে বেশি দুরে নয়। রাত এগারোটা থেকে সকাল এগারোটা পর্যন্ত তার ডিউটি। বিকেল বেলা সবাই জালান চৌকিট এলাকাতেই ঘুরলাম। বিভিন্ন শপিংমল এবং আশ পাশে ঘুরেই কাটল কুয়ালালামপুরে প্রথম দিন।

পরদিন ঘুম ভাংলো বেশ দেরিতে। কারন দীর্ঘ জার্নিতে ক্লান্তিরা চেপে বসেছিল। তাই লম্বা ঘুম দিয়ে উঠলাম। বাইরে প্রচন্ড গরম তাই সিদ্ধান্ত নিলাম লাঞ্চ করেই ঘুরতে বের হবো। ফ্রেশ হয়ে বেলা দুইটার দিকে বাংলাদশি রেস্টুরেন্টে গেলাম। কিছু সময় পর ওসমানী অাসলো তার এক পরিচিত ছোটভাইকে সাথে নিয়ে। গত রাতেই তার সাথে পরিচয় হয়েছে। নাম শাহজাহান, সেও স্টুডেন্ট ভিসায় এসেছে। সুনামগঞ্জেরর ছাতকে তাদের বাড়ি। এক সাথে লাঞ্চ করে বের হলাম। ওসমানী চলে গেল তার একটা কাজে। আজ আমাদের নিয়ে ঘুরতে যাবে শাহজাহান। মেট্রোরেল করে গেলাম বুকিত বিনতান। এখানেই সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি প্রবাসীরা বসবাস করে। তাই রেস্টুরেন্ট সহ অনেক বাংলাদেশি মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বলে রাখি কুয়ালালামপুরে মেট্রোরেল অার মনোরেলে খুব সহযেই অাপনি শহরের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গাতে মুভ করতে পারবেন। সময় এবং টাকা দুটিই সেইভ হবে।এক রিংগিত থেকে ৫ রিংগিতের মধ্যে কুয়ালালামপুরের যেকোন জায়গায় মুভ করতে পারবেন।

যারা মালয়েশিয়া ভ্রমণে যেথে ইচ্ছুক তারা সেটা মনে রাখবেন। বুকিত বিনতান থেকে পেট্রোনাস টুইনটাওয়ারে যখন গেলাম তখন বিকাল চারটা হয়ে গেছে। পেট্রোনাস টুইনটাওয়ার নির্মানশৈলীর অনন্যা নিদর্শন, যা মালয়েশিয়াকে পরিচর করিয়ে দিয়েছে সারা দুনিয়ায়। মালয়দের গর্বের টাওয়ার। লাখ লাখ পর্যটকদের পদচারনা ঘটে প্রতি বছর এখানে। যারা মালয়েশিয়া ভ্রমণে যান তাদের প্রথম পছন্দতেই থাকে এই টাওয়ার। কুয়ালালামপুরকে যেনো অক্সিজেন দিয়েছে এই টাওয়ার। বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করলাম অামরা। ফটোসেশন অার ঘুরে দেখা চলল অবিরত। টাওয়ারের পেছনে বিশাল ফুয়ারাতে অালো অার পানির খেলায় মুগ্ধতায় চরম শিখরে নিয়ে যায়। ভালোলাগায় পরিপূর্ণ হল মন। রাতের টুইনটাওয়ার যেনো আরো মাদকতা ছড়ায় ভালোলাগার। সন্ধ্যার পর মুভ করলাম অামরা। পাশেই বিলাসবহুল শপিং সেন্টার ফ্যাভিলিয়নে অনেকক্ষণ ঘুরলাম। চাইনিজ নববর্ষেরর অাগমন উপলক্ষে বর্ণিল সাজে সজ্জিত কুয়ালালামপুরের সব বড় বড় শপিংমলগুলো। মালয়েশিয়ার পুরোটাই মনে হবে মিনি চায়না। মালয়েশিয়ানদের পাশাপাশি চায়নিজ অার তামিলদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। তাদের প্রভাব ও অনেক বেশি সেখানে। আরো অাছে পিলিপাইনস এবং ইন্দোনিশিয়ান। রাত দশটা পর্যন্ত কুয়ালালামপুরের অনেক জায়গা ঘুরলাম। চোঁখ ধাঁধানো শপিংমল, রেস্টুরেন্ট এবং বিশ্বের সব নামি দামী ব্যান্ডের স্বর্গরাজ্য কুয়ালালামপুর। বিদেশী পর্যটকদের ভীড়ে মুখরিত রাতের কুয়ালালামপুর। বিদেশী পর্যটকদের জন্য সব সুযোগ সুবিধাই করে রেখেছে মালয় সরকার। তাই সারা বছর ধরেই লেগে থাকে পর্যটকদের ভীড় যা বড় অবদান রেখে চলেছে মালয়েশিয়ার অর্থনীতিতে। রাতের ডিনার সেরে গভীর রাত অবদি আড্ডা চলে ছোট ভাই ওসমানীর রেস্টুরেন্টে। রেস্টুরেন্টটি ২৪ ঘন্টা খোলা থাকে। ওয়াইফাই, খাওয়া দাওয়া আর আড্ডা শেষ করে প্রতি রাতেই ভোরে হোটেলে ফিরতাম। রাতের কুয়ালালামপুর অামার কাছে অারো উপভোগ্য মনে হতো। কুয়ালালামপুরে অনেক গরম, তাই অামরা সিদ্ধান্ত নিলাম প্রতিদিন একটু বেলা করেই ঘুরতে বেরুব।

৩১ জানুয়ারী মালয়েশিয়ার প্রসাশনিক রাজধানী পুত্রাজায়ার উদ্দেশ্য রওনা দেই অামি, রিয়াদ এবং শাহজাহান বেলা তিনটার দিকে। জালান চৌকিট থেকে বার্গিনিং করে টেক্সি নিলাম ৫৫ রিংগিত দিয়ে, ড্রাইভার মালয়শিয়ান। এখানে তামিলরা টেক্সি চালায় বেশি। এরা নাকি প্রায় সময় সমস্যা করে তাই আমরা তামিল টেক্সি ড্রাইভারদের এড়িয়ে চলতাম। কুয়ালালামপুর থেকে ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে ৪৬ বর্গকিলোমিটার জুড়ে পুত্রাজায়া। জনসংখ্যা ১.৮ মিলিয়ন।

মালয়েশিয়ার প্রথম প্রধানমন্ত্রী টেংকু আব্দুর রহমান পুত্রার নাম যুক্ত করে এলাকাটির নাম করন করা হয়েছে। ১৯৯৯ সালে রাজধানী কুয়ালালামপুর থেকে প্রসাশনিক কার্যক্রম পুত্রাজায়ার স্থানান্তর করা হয়। অাধুনিক মালয়েশিয়ার জনক ড. মাহাতির মোহাম্মদ ২০০১ সালের ১লা সেপ্টেম্বর থেকে পুত্রাজায়ার কার্যক্রম শুরু করেন। প্রায় ৪৫ মিনিট পর অামরা পুত্রাজায়ার পৌছালাম। অসম্ভব সুন্দর কুয়ালালামপুর পুত্রাজায়ার হাইওয়েটি। পুত্রাজায়ার যখন পৌছলাম তখন সময় সাড়ে তিনটা। বিশাল এলাকা নিয়ে গড়ে উঠেছে পুত্রা মসজিদ ও প্রসাশনিক ভবন। চারপাশ ঘীড়ে বিশাল লেক। প্রায় ১.৩৭ হেক্টর জায়গার উপর নির্মিত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে অাধুনিক এই মসজিদটি। ১৬৬ মিটার উঁচু মিনার এবং ৩৬ মিটার উঁচু গুম্বজের এই পুত্রা মসজিদটিতে এক সাথে ১০ হাজার মানুষ এক সাথে নামাজ আদায় করতে পারেন। চারপাশের বিশাল দৃষ্টিনন্দন লেক পুরো এলাকাটিকে করে তুলেছে আরো অাকর্ষনীয়। আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেট, রেস্তোরাঁ, ফাস্টফুড শপ সবই আছে লেকের পাশ ঘেষে। এছাড়াও পুত্রাজায়া ওয়াটনল্যান্ড পার্ক, পুত্রা ব্রিজ, মিলিনিয়াম মনোম্যান্ট রয়েছে সেখানে, যা দর্শনার্থীদের অাকর্ষনীয় বটে। বিকাল ছয়টা পর্যন্ত পুরো এলাকাটি ঘুরলাম অামরা। ভালোলাগাটা ছিল অসাধারন। পড়ন্ত বিকেলে যখন টেক্সি করে কুয়ালালামপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দেই তখন সূর্য অস্ত যাওয়ার খুব কাছাকাছি। সেই সূর্যাস্ত মুহুর্তটা যেনো অারো উপভোগ্য হয়ে উঠল হাইওয়েতে। ৭ টার কিছু আগে এসে নামলাম মার্দেকা স্কয়ারের কাছে। অনন্যা সুন্দর মার্দেকা স্কয়ার ও মাঠ।

 

মাঠের নিচে বিশাল পার্কিং ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে, যা মাঠে দাড়িয়ে বুঝার উপায় নেই। মার্দেকা স্কয়ার বা (MATARAN JAWI) সুলতান আব্দুস সামাদ ভবনের সামনে অবস্থিত। ১৯৫৭ সালের ৩১ শে আগস্ট এখানেই মালয়েশিয়ার স্বাধীনতার ঘোষনা করা হয় এবং পতাকা উত্তোলন করা হয়। সেই থেকে এটা স্বাধীনতা স্কয়ার হিসেবেই পরিচিত। পূর্বে এটা ছিল সেলাঙগর (পাদাং) ক্লাব, যা বর্তমানে রয়েল সেলাঙগর ক্লাব মাঠ। সন্ধ্যা আটটা পর্যন্ত সেখানেই ছিলাম। কুয়ালালামপুর সময় অাটটার পরে সন্ধ্যা হয়। মার্দেকা থেকে অামরা চলে যাই বুকিত বিনতান। কুয়ালালামপুরে যাত্রীদের জন্য ফ্রি বাস সার্ভিসও আছে। মিস না করে ফ্রি বাসও চড়লাম। বুকিত বিনতানের সবচেয়ে বড় অার পরিচিত বাংলাদেশ রেস্টুরেন্ট হলো রসনা বিলাস, সেখানে পরিচিত একজনের সাথে দেখা করে রাতে ফিরে অাসলাম জালান চৌকিট। রাতে অাসে আমার মামাতো ভাই নুর অাহমেদ দেখা করতে। সেও স্টুডেন্ট ভিসায় এসেছে, জব করছে অামেরিকান একটি ফাইভ স্টার হোটেলের রেস্টুরেন্টে। দুই দিনের ছুটি নিয়ে এসেছে আমাদের সময় দেওয়ার জন্য। রাতে যথারীতি ডিনার শেষ করে ওসমানীর রেস্টুরেন্টে জম্পেশ আড্ডা চলল গভীর রাত পর্যন্ত।

পরদিন সবাই মিলে বাতু ক্যাভস যাওয়ার প্ল্যান করে হোটেলে ফিরে গেলাম। পরদিন ১ ফেব্রুয়ারী সকালে দেখা করতে অাসে সিলেটের সংগীত শিল্পী মুন্নি। সে স্টুডেন্ট ভিসায় আসছে মালয়েশিয়া। এক সাথে লাঞ্চ শেষ করে চলে গেলাম তার করা নতুন ফ্যশন হাউসে। সেখান থেকেই বাতু ক্যাভসের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম ট্রেনে করে। আমি, রিয়াদ, ওসমানী, শাহজাহান এবং মামাতো ভাই অাহমদ। বাতু ক্যাভস মালয়েশিয়ার সোলাংগড়ে অবস্থিত, কুয়ালালামপুর সেন্ট্রাল থেকে পনের কিলোমিটার দূরে। মূলত মালয়েশিয়ান ইন্ডিয়ান এবং তামিল ইন্ডিয়ানদের ধর্মীয় তীর্ণস্থান সেটি। ধারনা করা হয় প্রায় চারশ মিলিয়ন বছর অাগের এই গুহাটি। চুনাপাথরের এই গুহাটি নিয়ে অনেক কথা প্রচলিত আছে। অামরা ট্রেনে করেই রওনা দিলাম, ট্রেনের লাস্ট ষ্টেশন বাতু ক্যাভস।

বিদেশী পর্যটক অার তামিলদের পদভারে মুখরিত এলাকাটি। মেলার মতো পসরা সাজিয়ে বসে অাছে তামিল নারী পুরুষ। দেখলে মনে হয় মিনি তামিলনাড়ু প্রদেশ। ব্যবসা থেকে শুরু করে সবকিছুই তামিল নিয়ন্ত্রিত এখানে। অামরা যখন পৌছালাম তখন ঘড়ি সাড়ে তিনটা। মূল গুহার সামনে সুব্রামানিয়া স্বামীর ৪২.৭ মিটার বা ১৪০ ফুট উচ্চতার বিশাল মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। ২০০৪ সালে শুরু করে ২০০৬ সালে সেটি উদ্ভোধন করা হয়। কংক্রিটের ১৫৫০ কিউবিট মিটার, ২৫০ টন ইস্পাত বার, এবং ৩০০ লিটার সোনার রং দিয়ে তৈরি করা হয়েছে সেটি, যা করতে ২.৫ মিলিয়ন রিংগিত ব্যায় হয়েছে। বাতু ক্যাভস গোহাটির প্রবেশদ্বার প্রায় ১০০ মিটার উঁচুতে, ২৭২ টি সিড়ি ডিঙিয়ে সেখানে প্রবেশ করতে হয়, যা খুবই কষ্টসাধ্য। তবুও পর্যটকদের অাগ্রহের কমতি নেই। অাশচর্য্যজনক এই গুহাটি দেখতে অামরাও ২৭২ টি সিড়ি ডিঙিয়ে প্রবেশ করি। অজানাকে জানার অাগ্রহ সব সময়ই তীব্র হয়। কয়েক হাজার স্কয়ার ফিটের এই গুহাটি দেখে অবাক না হয়ে উপায় নেই। প্রকৃতির অপার বিস্ময় সেটি। গোহার ভেতরে ছোট বড় বেশ ক’টি মন্দির। মন্দির ক্যাভ, মুরগান মন্দির, ডার্ক ক্যাভ এবং আরো অনেক কিছু। এখানে না অাসলে প্রকৃতির এই অপার সৃষ্টি দেখা থেকে বঞ্চিত হতাম। সিড়ি বেয়ে উঠার কষ্টটা স্বার্থক হয়েছে। পুরো গুহাটি ঘুরে দেখছি অার ক্যামেরাবন্দি করে রেখেছি স্বরনীয় এই মুহুর্তটাকে। প্রায় ৩০ মিনিটের মতো গুহার ভেতরে অবস্থান করে বেরিয়ে অাসলাম। পড়ন্ত বিকেলে পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড় অার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মিলেমিশে যেনো একাকার। তামিলদের এই রাজ্যে অনেকক্ষণ ঘুরলাম। বিশাল এলাকা জুড়েই যেন মেলা চলছে, তামিল মেলা, দেখে মনে হয়না এটা মালয়েশিয়ার কোন এলাকা। ঘুরে ফিরে দেখা আর টুকটাক কেনাকাটা করলাম সবাই। সাড়ে সাতটার দিকে ট্রেনে করে রওনা দিলাম বাতু ক্যাভস থেকে।

পরের দিন ২ ফেব্রুয়ারী মালয়েশিয়ায় অামাদের শেষ দিন। রাত ১১ টায় দেশে ফেরার বিমানে উঠতে হবে। কিন্তু একটি মুহুর্ত হেলায় নষ্ট করতে রাজি না অামরা। তাই সকালে বের হয়ে কিছু কেনাকাটা করলাম। তারপর দুপুর ১২ টার দিকে গেনটিং হাইল্যান্ডস যাওয়ার জন্য রওনা দিলাম। অাজকের ট্যুরে শুধু আমি, রিয়াদ এবং অাহমদ তিনজন গেলাম। প্রথমে কেএল সেন্ট্রাল তারপর সেখান থেকে বাসে করে গেনটিং। জনপ্রতি বাস ভাড়া ১০.৭০ রিংগিত। কেএল সেন্ট্রাল থেকে গেনটিং হাইল্যান্ডসের দুরত্ত প্রায় ৬০কিলোমিটার।বাসে যেতে সময় লাগে এক ঘন্টা দশ মিনিটের মতো। মালয়েশিয়ার পাহাংয়ে গেনটিং অবস্থিত। ১৯৬৫ সালে গেনটিং রিসোর্ট চালু হয়। ম্যাক্সিমস, গেনটিং গ্র্যান্ড হাইল্যান্ড সহ বেশ কটি তারকা হোটেল, ক্যাসিনো সেখানে অবস্থিত। ভুপৃষ্ট থেকে ১৮৬৫ মিটার বা ৬১১৮ ফুট উঁচুতে গেনটিং হাইল্যান্ডস। মেঘের রাজ্য বলা যায়।

এখানের অাবহাওয়া কুয়ালালামপুরের ঠিক বিপরীত। মেঘ অার ঠাণ্ডা বাতাসে এখানে তাপমাত্রা অনেক নিচে। ১০/১২ ডিগ্রি হবে, ঠান্ডার কাপড় সাথে না আনলে শীতের কবলে পড়তে হবে। পাহাড়ের অাকাঁবাকাঁ পথ ধরে প্রায় ঘন্টাখানেক পর পৌছে গেলাম প্রকৃতির স্বর্গরাজ্য গেনটিং হাইল্যান্ডসে। বাস থেকে নেমেই বিকাল ৪ টার বাসের টিকেট কাটলাম। কারন কোন রিস্ক নিতে রাজি নই, অনেক সময় নাকি শেষ দিকে বাস পাওয়া যায়না, ফিরতে হয় টেক্সি করে। বাট টেক্সির ভাড়া অনেক বেশি। তাই টিকেট আগেই কেটে রাখলাম। কারন বিকেলের মধ্যেই ফিরতে হবে আর রাতের ফ্লাইটে বাংলাদেশ। স্কাইওয়ে ষ্টেশন থেকে তিনজন রওনা দিলাম স্কাইওয়ে করে। ৩৩৮০ মিটার বা ১১০৯০ ফুট উঁচুতে উঠতে হবে স্কাইওয়ে করে। এ এক অদ্ভুত অনুভুতি। রশির মত ইলেক্ট্রনিক দুটি লাইনে উপরে যাওয়া আসা করতে হয় স্কাইওয়ে করে। যে কেউ ভয় পাবে প্রথমবার উঠলে। এতো উঁচুতে আবার এতো নিচুয়ে নামতে হয় যা ভাবলেই গা শিউরে উঠে। তবুও অ্যাডভেঞ্চারের শেষ নেই। প্রায় পনের বিশ মিনিট পর ৬১১৮ ফুট উঁচুর গেনটিং হাইল্যান্ডসে পৌছালাম। অাসলে সেই মুহুর্তের ভালোলাগার অনুভুতিটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। মেঘের রাজ্য ঘুরে বেড়ানো, মেঘ এসে ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে বার বার! কল্পনা করা যায় সেটা? চারপাশ ঘুরছি আর ভালোলাগার রাজ্য রাজার মতো অনুভূতি জাগছে। জীবনের শ্রেষ্ঠ ঘন্টা দুইয়েক সময় কাটালাম গেনটিং হাইল্যান্ডসে। এ ভাললাগা জীবনেও ভুলার নয়। যদি কয়েকদিন থাকা যেতো তাহলে অনেক অনেক ভাল লাগত। তবে মনকে সান্ত্বনা দিলাম অাবার অাসবো বলে। সব ভালালাগাকে পেছনে ফেলে চারটার বাস ধরে ফিরলাম কুয়ালালামপুর এবং সেখান থেকে মেট্রোরেল করে জালান চৌকিট। ফিরেই খাওয়ার শেষ করে বিদায়ের প্রস্তুতি শুরু করলাম। লাগেজ সকালেই গুছিয়ে দেখেছিলাম। ফ্রেশ হয়ে তৈরি হলাম দেশে ফেরার জন্য। এতো সুন্দর সময় কাটিয়েছি এই ছয়দিন যার প্রতিটি মিনিট ছিল ভাল লাগার এবং স্বরনীয়। ছয়টার দিকে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দেশের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। খুব খারাপ লাগছিল সবাইকে ছেড়ে আসতে। টেক্সি করে কেএল সেন্ট্রালে পৌছাতে দেড় ঘন্টা সময় লাগল। কুয়ালালামপুরে ভয়াবহ যানজটে পড়ে ফ্লাইট মিস করার পর্যায়ে পড়ে গিয়েছিলাম। অল্পের জন্য রক্ষা। রাত আটটার সময় কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্ট যাওয়ার দ্রুতগামী ট্রেন কেএল এক্সপ্রেস করে আমি আর রিয়াদ এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। আমার মামাতো ভাই অাহমদ কেএল সেট্রাল থেকে বিদায় দিল অামাদের। ৩০ মিনিটেই পৌছে গেলাম এয়ারপোর্টে। তারপর খুব দ্রুতই ইমিগ্রেশন শেষ করে টেনশনমুক্ত হলাম। কিন্তু খুব খারাপ লাগছিল সবার জন্য। এই কটি দিন সবার সাথে খুব সুন্দর কাটিয়েছি। সবাই ছিল বলে কোন সমস্যা ছাড়াই এক সপ্তাহ খুব ইনজয় করেছি।সবাই না থাকলে হয়তো এতো সহযে আর এতো সুন্দর সময় কাটানো সম্ভব হতনা। তাই মন না চাইলেও সবাইকে রেখে দেশের পথে বিমানে উঠতে হলো। মনকে সান্ত্বনা দিলাম অাবার অাসবো বলে, অাবার সুন্দর সময় কাটাবো সবার সাথে। বিমানে উঠার আগ পর্যন্ত সবার সাথে মোবাইলে যোগাযোগ হয়, তাদেরও মন খারাপ হয়ে আছে। ওসমানী, শাহজাহান, অাহমেদ, মুন্নি সবাইকে খুব মিস করছি। রাত ১২ টায় যখন আমাদের বহনকারী বিমানটি কুয়ালালামপুরের মাটি ছেড়ে গগনমূখী হলো তারই সাথে সাথে স্মৃতিময় এবং স্বরনীয় মালয়েশিয়া ভ্রমণ অধ্যায়ের সমাপ্তি টানতে হলো।

লেখকঃ

সম্পাদক

সিলনিউজ২৪.কম

১৩/০৫/২০১৭

Facebook Comments