অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে অর্থনৈতিক সূচকের অবস্থান।

সিলনিউজ২৪.কম: অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছেন, এ বছর জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, আমদানি ও রফতানি প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, মুদ্রা বিনিময় হারসহ সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকের অবস্থান সন্তোষজনক।

তিনি সোমবার (৮ মে) সংসদে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের পক্ষে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিক (জুলাই-ডিসেম্বর) পর্যন্ত বাজেট বান্তবায়ন অগ্রগতি ও আয়-ব্যয়ের গতিধারা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে এ কথা বলেন।

অর্থ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ১১ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা হলো ৭ দশমিক ২ শতাংশ।

তিনি বলেন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আওতাধীন রাজস্ব আদায় ১৭ দশমিক ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মোট সরকারি ব্যয় বেড়েছে ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ। আইএমইডির সূত্রমতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন বিগত অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকের ১৭ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২২ হাজার ৪২৭ কোটি টাকা হয়েছে। রফতানি আয় বিগত অর্থবছরের প্রথমার্ধের ১৬ হাজার ৮৪ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১৬ হাজার ৭৯৮ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আমদানি ব্যয় ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২২ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হয়েছে। ব্যক্তি খাতে ঋণপ্রবাহ ১৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ বেড়েছে (ডিসেম্বর’১৫ থেকে ডিসেম্বর’১৬)। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রায় ৩২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।

তিনি বলেন, পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর ৬ দশমিক ১০ শতাংশ থেকে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে ৫ দশমিক ০৩ শতাংশে নেমে এসেছে।

মন্ত্রী বলেন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৪২ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা। দ্বিতীয় প্রান্তিকে আহরিত রাজস্বের পরিমাণ ৮৮ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা, যা বাজেটের লক্ষ্যমাত্রার ৩৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ।

এম এ মান্নান বলেন, চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে মোট ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে অনুন্নয়নসহ অন্যান্য ব্যয় ২ লাখ ২৯ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ব্যয় ১ লাখ ১০ হাজার ৭শ’ কোটি টাকা। দ্বিতীয় প্রান্তিকে মোট ব্যয় হয়েছে ৯৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে অনুন্নয়নসহ অন্যান্য ব্যয় ৭৩ হাজার ৭৬ কোটি টাকা। সার্বিকভাবে চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে গত অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকের তুলনায় অনুন্নয়নসহ অন্যান্য ব্যয় ২৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

অর্থ প্রতিমন্ত্রী বলেন, চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি প্রাক্কলন করা হয়েছে ৯২ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা, যা জিডিপি’র ৪ দশমিক ৭০ শতাংশ। অনুদানসহ ঘাটতি অর্থায়নে বৈদেশিক উৎস থেকে ১ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং অভ্যন্তরীন উৎস থেকে ৩ দশমিক ১৩ শতাংশ সংস্থানের পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থবছরের প্রথমার্ধে মোট বাজেট ঘাটতি জিডিপি’র ০ দশমিক ৩৩ শতাংশ দাঁড়িয়েছে। বিগত অর্থবছরের একই সময়ের বাজেট উদ্বৃত ছিল জিডিপি’র ০ দশমিক ০৫ শতাংশ।

তিনি বলেন, বিগত অর্থবছরে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক শেষে এই প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থবছর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ। ঘাটতি অর্থায়নে ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বৈদেশিক উৎস থেকে নিট অর্থায়ন বিগত অর্থবছরের একই সময়ের ৭৭৬ কোটি টাকা থেকে হ্রাস পেয়ে ৩২৪ কোটি টাকা হয়েছে।

এম এ মান্নান বলেন, আর্থিক মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধির সাথে সাথে আমানত ও ঋণের সুদের হার ক্রমান্বয়ে কমে আসছে। একই সাথে সুদের হার কমে আসছে। চলতি অর্থ বছরের ডিসেম্বর শেষে আমানতের সুদের হার ৫ দশমিক ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। বিগত অর্থবছরের একই সময়ে এই হার ছিল ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ। একই সময়ে ঋণের সুদের ভারিত গড় হার ১১ দশমিক ১৮ শতাংশ কমেছে। এ সময় কৃষি খাতে ঋণের সুদের হার ৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ থেকে ৯ দশমিক ৩১ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে। সামগ্রিকভাবে সুদের হার ব্যবধান এ সময়ে ৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ থেকে ৪ দশমিক ৭১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

তিনি বলেন, জনজীবনে স্বস্তি বজায় রাখতে মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। এ বিষয়ে সরকারের বিরাট সাফল্য রয়েছে। বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে ছিল প্রায় ৬ দশমিক ১৯ শতাংশ, যা ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৫১ শতাংশে।

অর্থ প্রতিমন্ত্রী বলেন, খাদ্য মূল্যস্ফীতি ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে ৬ দশমিক ০৫ শতাংশ থেকে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে ৪ দশমিক ৫১ শতাংশে নেমে এসেছে।
তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩৪ হাজার ২৫৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার যা বিগত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ৭৭ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ৭৯৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বিগত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ বেশি।

এম এ মান্নান বলেন, চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত আমদানি ব্যয় হয়েছে ২২ হাজার ৬১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বিগত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ বেশি।

অর্থ প্রতিমন্ত্রী বলেন, চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে প্রবাস আয়ের প্রবাহ ছিল ৬ হাজার ১৬৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, বিগত অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ৭ হাজার ৪৮৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। অর্থাৎ এ সময়ে প্রবাস আয়ের প্রবাহ ১৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ কমেছে। তবে আশার কথা ২০১৫ সালে বিদেশে প্রেরিত জনশক্তির সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৫৫ হাজার ৮৮১ জন, যা ২০১৬ সালে এসে দাঁড়ায় ৭ লাখ ৫৭ হাজার ৭৩১ জন। অর্থাৎ ২০১৬ সালে জনশক্তি রপ্তানী ৩৬ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭৯৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। একদিকে অভ্যন্তরীন চাহিদা বৃদ্ধির প্রভাবে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, অন্যদিকে প্রবাস আয় প্রবাহের দুর্বলতা চলতি হিসাবে ঘাটতি সৃষ্টিতে ভূমিকা পালন করছে। তবে মূলধনী হিসাব ও আর্থিক হিসাবে উল্লেখযোগ্য উদ্বৃত থাকায় বৈদেশিক মূদ্রার রিজার্ভের পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৬ সালের ডিসেম্বর শেষে পূর্ববর্তী একই সময়ের তুলনায় বৈদেশিক মূদ্রার রিজার্ভ ১৯ দশমিক ৫৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩২ দশমিক ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। এ রিজার্ভ দিয়ে প্রায় ৮ দশমিক ৪ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।

এছাড়া অর্থ প্রতিমন্ত্রী প্রতিবেদনে অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, যোগাযোগ অবকাঠামো, কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন, জনকল্যাণ, প্রবাসী কল্যাণ, শিল্পখাতসহ সার্বিক খাতের অগ্রগতি তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরে কৃষিতে ভর্তুকি খাতে ৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সরকার নিরাপত্তা বেষ্টনী কার্যক্রমের আওতায় সুলভ মূল্য ও ইউনিয়ন পর্যায়ে খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে হতদরিদ্রদের জন্য নির্ধারিত মূল্যে কার্ডের মাধ্যমে ৫০ লাখ হতদরিদ্র পরিবারকে প্রতি কেজি ১০ টাকা মূল্যে কার্ড প্রতি মাসে ৩০ কেজি করে চাল বিতরণের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের নভেম্বর পর্যন্ত এই কর্মসূচির আওতায় ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৬৯৩ মেট্রিক টন এবং সুলভ মূল্য কর্মসূচির আওতায় ৫ হাজার ৬৭৯ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।

এম এ মান্নান বলেন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও যোগাযোগ খাতে সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিনিয়োগ সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ধীরে ধীরে জনগণের জ্ঞানের পরিধি ও দক্ষতা বাড়াচ্ছে। ফলে জনগণের জীবনবোধে ইতিবাচক পরিবর্তন সূচিত হচ্ছে।

তিনি বলেন, সব মিলিয়ে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত, সুষম, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ গঠনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা, প্রধানমন্ত্রীর সুযোগ্য নেতৃত্ব, মানুষের নিরন্তর প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

Facebook Comments