সিলেটের মতো বগুড়ায় মৃদু ভূকম্পন,বড় দুর্যোগের আভাস

 জলবায়ুর অস্বাভাবিক আচরণ। আকাশে সাদাকালো মেঘের এলোমেলো উপস্থিতি। সিলেটে ভিন্ন ধরনের ভূমিকম্প। হাওড়ে অসময়ে পাহাড়ী ঢলে বন্যা। এই ভারি বৃষ্টি, এই তীব্র গরম। কখনও শীতল বায়ু কখনও উষ্ণ বায়ুর তাপে বায়ু মন্ডলে বড় পরিবর্তন। দেহ-মনে অন্য ধরনের প্রভাব। শরীর ম্যাজম্যাজ, মাথা ধরা, তন্দ্রাচ্ছন্নভাব, কখনও অসময়ে ঘুম পাওয়া, প্রশান্তি না থাকা ইত্যাদি কারণে জীবনযাত্রা ব্যাহত। লোকে ঠাহর করতে পারছে না কী হতে যাচ্ছে সামনের দিনগুলোতে। ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কিত।

প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সঙ্গে মনুষ্য সৃষ্ট বিপর্যয় একীভূত হয়ে কাজ বিধ্বংস থাবা পড়তে যাচ্ছে মানুষ ও প্রাণীকুলে। ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’র মতো ডাউকি ফল্টে সিলেটে এ যাবতকালের সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের ভূমিকম্প মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে। শঙ্কিত করছে। ওই ভিন্ন ধরনের ভূমিকম্পের মতো বগুড়া অঞ্চলেও মাঝেমধ্যে অস্বাভাবিক কম্পন অনুভূত হয়।সিলেটে ভিন্ন ধরনের ভূমিকম্পের প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর বগুড়া ও আশপাশের এলাকার লোকজন বলাবলি করছেন একই ধরনের কম্পন তারা অনুভব করেন বিভিন্ন সময়ে। হঠাৎ মনে হয় কি যেন নড়ে উঠল। বাড়িতে বসে থাকার সময় কখনও মনে হয় কিছু বোধহয় নড়ল। একটা ঝাঁকুনি দিল। ছাদে তাকালে বৈদ্যুতিক ফ্যান স্থির দেখলে মনে হয় কিছুই নয়। সিলেটের ভিন্ন ধরনের ভূমিকম্পের সময় ফ্যানের নড়াচড়া না করার খবর পাঠের পর পরিষ্কার ধারণা হয়েছে একই ধরনের ভূমিকম্প মাঝেমধ্যেই হচ্ছে। বগুড়ায় কদিন আগে ঝড়বৃষ্টির সময়ও এমন ঝাঁকুনি অনুভূত হয়।

ভূবিজ্ঞানীগণ, ভূকম্পন ঝুঁকি জরিপকারী দল এশিয়ান ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রিপার্ডনেস সেন্টার (এডিপিসি) বগুড়ার ভূগর্ভে বড় ধরনের ফাটল লক্ষ্য করেছে। এই ফাটল পূর্বাঞ্চলের সিলেট থেকে বগুড়ার ওপর দিয়ে বড় ধরনের একটি ফল্ট উত্তর-পূর্বে বিস্তৃত। মাটির নিচে পানি, বালি, শিলাস্তর সাজানো থাকে। বগুড়া অঞ্চলে প্রায় ২৫ বছর ধরে বড় ব্যাসার্ধের পাইপ ভূ-অভ্যন্তরে ড্রিলিং করে উচ্চ ক্ষমতার শ্যালো ইঞ্জিনের শক্তিতে চিকন বালি উত্তোলন করা হচ্ছে। প্রথমে আসে পানি। তারপর চিকন মসৃণ বালি পানির সঙ্গে ওপরে ওঠে। এ সময়ে সাজানো শিলাস্তরে বিচ্যুতি ঘটে। ভূগর্ভে সৃষ্টি হয় বড় ধরনের শূন্যতা। এই ফল্টে মাঝারি ঝাঁকুনি সহ্য করার ক্ষমতা আর নেই।

এদিকে আকাশের মেঘের আচরণও বিরূপ। মেঘ দেখে কিছু বলা যায় না। কখনও বর্ষার মেঘ। কখনও কুয়াশা। আবার সাদা মেঘে দাবদাহ। এর মধ্যেই ঠান্ডা। আবহাওয়াবিদের কথা, এটা বিকিরিনজনিত ঠান্ডা। বঙ্গোপসাগর থেকে বাতাস আসছে না। আসছে উত্তর-পশ্চিম কোন থেকে। ঠান্ডা হলেও তা শুষ্ক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট এক অশনিসঙ্কেত দিয়েছে: এই বছর হবে বিশ্বে সর্বোচ্চ উষ্ণায়নের বছর। যার ভয়াবহ প্রভাব পড়বে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে। বাংলাদেশ ও ভারতে এ যাবতকালের সর্বোচ্চ তাপপ্রবাহ বইতে থাকবে। এই দাবদাহ হবে দীর্ঘস্থায়ী। ভারতের দিল্লীতে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রী সেলসিয়াস অতিক্রম করতে পারে। বাংলাদেশেও দাবদাহের সঙ্গে দেখা দেবে তীব্র খরা। কিছুদিন ধরেই বাংলাদেশের আবহাওয়া অনেকটাই মরু অঞ্চলের মতো।

দেশে বর্তমানে কোন ঋতুই ঠিকমতো আসে না। শীত এবার তেমন আসেনি। মাঘ চেনা যায়নি। চৈত্রের প্রথম সপ্তাহে বর্ষা। কয়েক বছর ধরেই বর্ষার প্রাণ নেই। শরত, হেমন্ত ঋতু শুধু কাব্যে। গ্রীষ্মটা একটু জানান দেয়। এবারের গ্রীষ্মের দাবদাহ কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকে তা ভাবছেন জলবায়ুর বিজ্ঞানীরা। প্রকৃতির স্বাভাবিক চিত্র ক্রমেই সরে যাচ্ছে। দিন দিন উষ্ণ হচ্ছে বায়ুমন্ডল। এর মধ্যেই শীতল হাওয়া। বিজ্ঞানীগণ যে ভয়ঙ্কর তথ্য দিয়েছেন তা হলো গ্রীষ্মমন্ডলীয় পর্যায়বৃত্ত পরিবর্তনে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা অন্তত এক মিটার বেড়ে তাপমাত্রা বিশ্বের বিপজ্জনক মাত্রার একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। যা ডেকে আনবে বড় ধরনের বিপর্যয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট এ্যান্ড সোসাইটির ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টার এবং এ ধরনের ভারতের কয়েকটি কেন্দ্র জানাচ্ছে, চলতি বছর হবে ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণতম বছর। এদিকে জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার খবর, চলতি বছর পূর্বের সকল সময়ের চেয়ে তাপমাত্রা গড়ে ১ দশমিক ২ ডিগ্রী বেড়ে যেতে পারে। সংস্থার মহাপরিচালক বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণতার মাত্রা প্রতিবছর একটু করে বাড়ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতার এমন অবস্থা থাকলে বিশ্ব প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হবে। যে প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো পূর্বের সকল দুর্যোগকে ছাড়িয়ে যাবে। যা হতে পারে ভয়ঙ্কর।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল এ্যারোনটিকস এ্যান্ড স্পেস এ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নাসা) ও ন্যাশনাল ওসেনিক এ্যান্ড এটমোসফেরিক এ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (নোয়া) ক্লাইমেট ডাটা সেন্টার চলতি বছরকে বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি প্রাকৃতিক দুর্যোগের বছর বলছে। যার প্রভাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কায় কৃষি ভূমি, জীববৈচিত্র্য, রোগব্যাধিসহ নানা বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। অসময়ে বন্যা এবং দীর্ঘ খরার কবলে পড়ে ফসল উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। সেচের পানি উত্তোলন সহজ হবে না। পানির স্তর যার পর নেই নিচে চলে যাবে। প্রভাব পড়বে আবাদ কার্যক্রমে। ভূগর্ভ থেকে সুপের পানিপ্রাপ্তি স্বাভাবিক পর্যায়ে থাকবে না। এই অবস্থায় সবচেয়ে ভয়াবহ সঙ্কটে পড়বে রাজধানী ঢাকা মহানগরী ও আশপাশের মানুষ।

Facebook Comments