হাওরাঞ্চলে কেউ না খেয়ে থাকবে না: প্রধানমন্ত্রী

সিলনিউজ২৪.কমঃ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বন্যাদুর্গত হাওড়বাসীর চরম এই দুঃসময়ে পাশে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বলেছেন, হাওড়ের একটি লোককেও না খেয়ে মরতে দেব না। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য যা যা করা লাগে আমরা সবই করব। যত খাবার লাগবে আমরা দিতে পারব। প্রয়োজনে আমদানি করব। প্রধানমন্ত্রী থাকি আর না থাকি, বঙ্গবন্ধুর মেয়ে হিসেবে সবসময় আপনাদের পাশে থাকব।

অকাল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হাওড় এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে রবিবার সুনামগঞ্জের শাল্লায় এক আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, বন্যায় ফসলহানির সুযোগ নিয়ে কেউ যদি দেশের বাজারে খাদ্যশস্যের দাম বাড়িয়ে দেয়, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ধরনের কিছু ঘটালে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

হাওড়ের বোরো ফসল রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ নির্মাণে ওঠা অনিয়ম-দুর্নীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাঁধ নির্মাণে কারও গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বেসরকারী সংস্থাগুলোর (এনজিও) উদ্দেশে বলেন, আমি এনজিওগুলোকে নির্দেশ দেব, তারা যেন ঋণের টাকা আদায়ে কৃষকদের ওপর চাপ না দেয়। আপাতত কিস্তি আদায় স্থগিত করে সুদ মওকুফেরও আহ্বান জানান তিনি।

স্থানীয় সুধী সমাবেশে বক্তব্য রাখছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রীর হেলিকপ্টারটি শাল্লা উপজেলার শাহেদ আলী মডেল উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অবতরণের আগে প্রধানমন্ত্রী হেলিকপ্টারে করে সমগ্র দুর্গত এলাকা ঘুরে দেখেন। তিনি পরে স্পিড বোটে করেও কিছু কিছু দুর্গত এলাকায় যান। প্রধানমন্ত্রী এখানে ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকান্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত সিনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে সবাই যেন পর্যাপ্ত ত্রাণ সুবিধাটা পান তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করেন এবং তিনি নিজে উপস্থিত থেকেও দুর্গতদের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন।

পরে শাহেদ আলী মডেল উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত স্থানীয় এক সুধী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। হাওড়ের ফসলের ক্ষতি হয়েছে, কিন্তু তাতে দেশের খাদ্যেরও পর প্রভাব পড়বে না। যত খাবার লাগবে আমরা দিতে পারব। সরকার বিনামূল্যে যে খাদ্য বিতরণ চালু করেছে সেটা অব্যাহত থাকবে ততদিন পর্যন্ত, যতদিন না এখানে আকাল দূর হচ্ছে। প্রয়োজনে ভিজিএফের সংখ্যা বাড়ানোর ঘোষণা দেন তিনি।

জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলামের পরিচালনায় সুধী সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীর বিক্রম, খাদ্যমন্ত্রী এ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, পানিসম্পদমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, অর্থ প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান, স্থানীয় সংসদ সদস্য ড. জয়া সেনগুপ্তা প্রমুখ।

প্রধানমন্ত্রী ভিজিএফ, ভিজিডি, ওএমএস, ১০ টাকা কেজির খাদ্যবান্ধব কর্মসূচী উপজেলা থেকে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত বাড়ানোর জন্য জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দিয়ে বলেন, দেশে বর্তমানে খাদ্যের কোন ঘাটতি নেই এবং হাওড় এলাকা থেকে দেশের খাদ্য চাহিদার একটি স্বল্প অংশই পূরণ হতো। কাজেই খাদ্যশস্যের সরবরাহ কমতির অজুহাতে কোনভাবেই খাদ্যের দাম বাড়ানোর কোন সুযোগ নেই। যারা এ ধরনের কা- ঘটাবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী দুর্গত প্রত্যেক পরিবারকে মাসে ৫শ’ টাকা করে প্রদান এবং সার, বীজ, কীটনাশকসহ অন্যান্য কৃষি উপকরণ কৃষকদের মধ্যে বিনামূল্যে প্রদানের ঘোষণা দিয়ে বলেন, হাওড়ের বন্যাকবলিত এলাকায় বিতরণের জন্য তিন হাজার ৫২৪ মেট্রিক টন চাল এবং নগদ ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ভয় না পাবার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তাঁর সরকারের নির্দেশে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, কর্মকর্তাবৃন্দ, স্থানীয় প্রশাসনসহ সকল মহল নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট রয়েছে। কাজেই খাদ্য সরবরাহ এবং দুর্গত জনগণের সাহায্যের বিষয়ে সংশয়ের কোন অবকাশ নেই।

প্রধানমন্ত্রী হাওড় এলাকার মানুষকে শুধু ফসলের ওপর নির্ভরশীল না থেকে মাছ, গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে বলেন, আমার কোন চাওয়া পাওয়া নেই, এদেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই আমাদের কাজ। আমার পরিবারের ২৮ জন সদস্য দেশের জন্য প্রাণ হারিয়েছেন। আমি দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যেতে চাই। আমি বঙ্গবন্ধুর মেয়ে। প্রধানমন্ত্রী থাকি আর না থাকি বঙ্গবন্ধুর মেয়ে হিসেবে আমি সবসময় আপনাদের পাশে থাকব। তিনি বলেন, সিলেট বিভাগের সব জেলায় ভূমিহীনদের বিনা পয়সায় ঘর তুলে দেয়া হবে, কেউ ভূমিহীন থাকবে না। কেউ ভিক্ষা করতে পারবে না। যা যা মানুষের প্রয়োজন সব আমরা দেব। সবাই যাতে সম্মানের সঙ্গে থাকতে পারেন তা আমরা করব। হাওর এলাকায় শিক্ষার উন্নয়নে আবাসিক স্কুল করব।

শেখ হাসিনা বলেন, বন্যার পানি দূর হয়ে নতুন ফসল ওঠার আগ পর্যন্ত কৃষিঋণের টাকা ফেরত দেয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ থাকবে এবং এর প্রদেয় সুদের টাকাও অর্ধেক করে দেয়া হবে। ত্রাণ বিতরণ ঠিকমতো হচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণে প্রশাসনের কর্মকর্তা ও স্থানীয় নেতাদের নির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত সব জেলায় ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছাচ্ছে কিনা, সেগুলো ঠিকমতো বিতরণ করা হচ্ছে কিনা তা দেখার জন্য অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিবদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এ কাজে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় নেতৃবৃন্দসহ সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

হাওড়বাসীর ভাগ্যোন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচীর কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হাওড়াঞ্চলে ভিজিএফ কার্ড বিতরণ অব্যাহত থাকবে এবং ভবিষ্যতে তা আরও বাড়ানো হবে। যেসব কৃষক কৃষিঋণ নিয়েছেন তাদের সুদের হার অর্ধেকে নামিয়ে এনেছি। কৃষকদের কাছ থেকে বন্যার সময় ঋণের টাকা আদায় করা হবে না। এখানে আবাসিক স্কুল নির্মাণ করা হবে আরও বেশি। প্রয়োজনীয় সার ও কৃষি সহায়তা বাড়ানো হবে। কৃষিঋণ অর্ধেকে নামিয়ে আনা হবে।

তিনি আরও বলেন, আমি যখন ১৯৯৮ সালে প্রধানমন্ত্রী ছিলাম তখনও বন্যা হয়েছিল। সেই সময় দুই কোটি মানুষ না খেয়ে থাকবে এমন কথাও বলা হয়েছিল। আমি একটি মানুষকে না খেয়ে থাকতে দেইনি। সবাই খাবার পেয়েছে। হাওড়াঞ্চলে ধান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্য জেলাগুলোতে ভাল ধান হয়েছে। এছাড়া সরকারের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার মজুদ আছে। তাই একটি মানুষও না খেয়ে থাকবে না। বিশ্বাস রাখবেন, আপনাদের যাতে কোন কষ্ট না হয় সে চেষ্টা আমরা করব।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, নদীর দু’কূল উপচে পানি ঢোকে হাওড়ে। তাই আমরা নদী ড্রেজিং করার উদ্যোগ নিয়েছি। এরই মধ্যে কাজ শুরু হয়ে যাবে। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জন্য পরিকল্পনা করতে হবে। সেজন্য প্রকৌশলীদের নিয়ে পরামর্শ করে কাজ করতে হবে। পানির নিচে কয়েকদিন পর্যন্ত থাকলেও নষ্ট হবে না এমন জাতের ধান আবিষ্কার করেছেন আমাদের দেশের গবেষকরা। পরীক্ষামূলকভাবে সেটি চাষ করে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এরই মধ্যে লবণ ও খরাসহিষ্ণু ধানের জাত আবিষ্কার করা হয়েছে।

হাওড়াঞ্চলের এক ফসলের চিন্তা না করে সরিষা, শাক-সবজিসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসল আবাদ করার পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হাওড়ের খালগুলো যেন বেশি পানি নিষ্কাশন করতে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে। হাওড়কে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। প্রকৃতিকে কাজে লাগাতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করেই আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। আর হাওড়ের সম্ভাবনাকেও কাজে লাগাতে হবে। হাওড়ে কী ধরনের বাঁধ দেয়া যায়, আদৌ বাঁধ লাগবে কিনা, দিলে পরে আবার প্রাকৃতিক পরিবেশের কোন ক্ষতি হবে কিনা- এসব বিষয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখার কথাও বলেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, হাওড়ে গো-খাদ্যের অভাব রয়েছে, সেটাও দেয়া হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নগদ সহায়তা এবং আগামী মৌসুমের জন্য বিনামূল্যে সার ও বীজ দেয়া হবে। মৎস্যজীবী ও কৃষকদের ঋণের সুদের হার অর্ধেক করা হবে। মাছের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পানি একটু নামলেই এখানে মাছের পোনা অবমুক্ত করা হবে।

প্রসঙ্গত, দুর্যোগ ও ত্রাণ পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, বন্যায় সুনামগঞ্জ, সিলেট, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ এবং মৌলভীবাজার এই ৬ জেলার ৬২ উপজেলার ৫১৮ ইউনিয়নের সাড়ে ৮ লাখ পরিবার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২ লাখ ৪৯ হাজার ৮৪০ হেক্টর জমির বোরো ফসল নষ্ট হয়েছে এবং ১৮ হাজার ২০৫ বাড়ি-ঘরের পুরোপুরি বা আংশিক ক্ষতি সাধন হয়েছে। এসব এলাকায় ত্রাণ বিতরণের জন্য ৫৮৭টি ত্রাণ কেন্দ্র খোলা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৪ হাজার ২২৪ মেট্রিক টন জিআর চাল এবং ২ কোটি ২৫ লাখ ৯৭ হাজার টাকা মানবিক সাহায্য হিসেবে দুর্গতদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে ভিজিএফ কর্মসূচীও চালু করা হয়েছে।

Facebook Comments