হুজি নেতা জঙ্গি মুফতি হান্নানের যত অপরাধ।

সিলনিউজ২৪.কমঃ পাকিস্তানে প্রশিক্ষণ এবং আফগানিস্তানে তথাকথিত ‘জিহাদ’ থেকে ফিরে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ ও বোমা-গ্রেনেডের আতঙ্ক কায়েম করতে চেয়েছিলো মুফতি আবদুল হান্নান। হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের (হুজি-বি) এই জঙ্গি নেতার নির্দেশনায় শক্তিশালী বোমায় বার বার কেঁপেছে দেশ। রক্তাক্ত হয়েছে মাজার থেকে শুরু করে রাজপথ, জনসভা এমনকি সংস্কৃতি অঙ্গন।

হুজি জঙ্গিদের এসব হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন শতাধিক মানুষ, আহত হয়েছেন ৬ শতাধিক। অন্তত ১৩টি নাশকতামূলক ঘটনায় সরাসরি কলকাঠি নেড়েছিলো মুফতি হান্নান। ২০০০ সালে এ জঙ্গি-গডফাদারের নাম চলে আসে খবরের পাতায়। কারণ তার পরিকল্পনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে ৭৬ কেজি বোমা পুঁতে রাখা হয়েছিলো গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টসহ চারবার শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করেছিলো হান্নানের হুজি জঙ্গিরা। ২০০৪ সালে ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরিকে গ্রেনেডে রক্তাক্ত করা ছাড়াও ২০০৫ সালে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়াকেও হত্যা করা হয়েছিলো তার প্রত্যক্ষ ইন্ধনে।

জঙ্গিবাদের প্রথম ছোবলঃ
১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলার মধ্য দিয়ে এ দেশে গোপন জঙ্গি সংগঠন হুজি-বির নাশকতা শুরু। হুজি-বির কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সিদ্ধান্তে মুফতি হান্নান ও মুফতি আবদুর রউফের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় এ হামলা হয় বলে হান্নানের জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে। ওই হামলায় ১০ জন নিহত ও দেড়শ জন আহত হন। এরপর একই বছরের ৮ অক্টোবর খুলনা শহরের আহমদিয়া মসজিদে বোমা হামলা হয়। ওই হামলায় নিহত হন আটজন।

উদীচীর দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলনের শেষ দিনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলার সময় পরপর দুটি বোমা হামলা

২১ আগস্টের আগে ৩ বার হান্নানের টার্গেট হন শেখ হাসিনাঃ
মুফতি হান্নান ২০০৬ সালের ১৯ নভেম্বর ঢাকার একটি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জবানবন্দি অনুযায়ী, ২০০০ সালের জুলাই মাসে হুজির কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। ওই বছরের ২০ জুলাই কোটালীপাড়ায় শেখ হাসিনার সমাবেশস্থল ও হেলিপ্যাডের কাছে দুটি শক্তিশালী বোমা পুঁতে রাখা হয়েছিল যা সমাবেশের আগে পুলিশ উদ্ধার করে।

কোটালীপাড়ায় বোমা পুঁতে রাখার আগে দূর নিয়ন্ত্রিত এই বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটানো হয় ফরিদপুরে এক পীরের মাহফিলে। ২০০০ সালের ১৩ জুলাই ওই বোমা বিস্ফোরণে একজন নিহত হন, গুরুতর আহত হন সাতজন। কোটালীপাড়ায় হত্যার পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার পর ২০০১ সালের ৩০ মে খুলনায় রূপসা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল হুজি। কিন্তু তিন দিন আগে ২৭ মে সেতুর কাছাকাছি রূপসা নদী থেকে দুটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা থেকে ১৫ জঙ্গি ধরা পড়ে যাওয়ায় সেটি আর সফল হয়নি। গ্রেপ্তার হওয়া ওই ১৫ জনই মুফতি হান্নানের নেতৃত্বাধীন হুজির সদস্য।

জবানবন্দিতে মুফতি হান্নান বলেন, ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে শেখ হাসিনা সিলেটে নির্বাচনী জনসভায় গেলে সেখানে বোমা পেতে তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। ২০০১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর রাত ৮টার দিকে সিলেট শহরের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে আওয়ামী লীগের জনসভাস্থলের কাছাকাছি ফাজিল চিশতি এলাকায় আরিফ আহমেদ রিফার ভাড়া দেওয়া মেসে বোমা বানানোর সময় বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ঘটনাস্থলে দুই বোমাবাজ নিহত হয়।

বর্ষবরণ হলো ছিন্নভিন্নঃ
২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষ পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে রমনা বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠান চলাকালে সকাল ৮টা ৫ মিনিটে মূল মঞ্চের ১৫-২০ গজ দূরে দক্ষিণ-পশ্চিমে বেষ্টনীর বাইরে বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। বোমা হামলায় ঘটনাস্থলে নিহত হন ৯ জন এবং আহত একজন হাসপাতালে মারা যান।

পাকিস্তানের মতো এদেশের মাজারেও গ্রেনেডঃ
২০০৪ সালের ২১ মে সিলেটে হযরত শাহজালাল (রহ.) এর মাজারে যান ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী। ফেরার পথে ফটকের কাছে গ্রেনেড হামলায় আনোয়ার চৌধুরীসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। নিহত হন পুলিশের দুই কর্মকর্তাসহ তিনজন। এ মামলাতেই মুফতি হান্নানসহ তিনজনের মৃত্যুদণ্ড এখন কার্যকরের অপেক্ষায়।

২০০৪ সালের ২১শে মে সাবেক ব্রিটিশ হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরী সিলেটে হযরত শাহজালালের মাজারে গ্রেনেড হামলার শিকার হন

টার্গেট হাসিনা, গ্রেনেড ছুড়লো হুজিঃ
আগে বারবার শেখ হাসিনাকে হত্যা পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার পর ২০০৪ সালে মুফতি হান্নানের হুজির হাতে আসে আর্জেস গ্রেনেড। তখন শেখ হাসিনা বিরোধীদলে। সেসময় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী, নেতা ও দলটির শীর্ষ পর্যায়ের সহযোগিতায় ২১ আগস্ট চূড়ান্ত হামলা হয় শেখ হাসিনার জনসভায়। এ যাত্রায়ও প্রাণে বেঁচে যান শেখ হাসিনা। কিন্তু গ্রেনেড হামলায় নিহত হন আইভি রহমানসহ ২২ নেতাকর্মী।

২১ আগস্ট, ২০০৪। দিনটি ছিল শনিবার। বিকেলে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে সন্ত্রাস ও বোমা হামলার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সমাবেশেই চালানো হয় গ্রেনেড হামলা

রক্ষা পাননি প্রবীণ রাজনীতিক কিবরিয়াওঃ
মুফতি হান্নানের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় সর্বশেষ গ্রেনেড হামলা হয় ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জের এক সমাবেশে। ওই হামলায় আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা ও সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়াসহ পাঁচজন নিহত হন।

এসব বোমা ও গ্রেনেড হামলার ঘটনায় মুফতি হান্নানের বিরুদ্ধে ১৭টি মামলা হয়েছে। দুটির বিচার শেষ হয়েছে। মুফতি হান্নান ২০০৬ সালের ১৯ নভেম্বর এবং ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর দুই দফায় ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে এসব হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের বিস্তারিত বিবরণ দেয়। এর আগে ২০০৫ সালের ১ অক্টোবর রাজধানীর বাড্ডার বাসা থেকে গ্রেপ্তার হয় মুফতি হান্নান।

Facebook Comments