পাচ্যের বিস্ময় বাংলাদেশ | অর্থনীতি |

মরক্কোর পর্যটক ও পন্ডিত ইবনে বতুতা ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলা ভ্রমণে এসে এ অঞ্চল সম্পর্কে লিখেছিলেন, খাদ্যশস্যের প্রাচুর্য ও অত্যন্ত উর্বরতাসমৃদ্ধ এক জলসিক্ত বাগান, যেখানে অধিকাংশ লোক কৃষি কিংবা কাপড় বুননে জড়িত। এই প্রখ্যাত ভূপর্যটকের বর্ণনা প্রায় সাত শতাব্দী পরও যেন এ ঘন শ্যামলিমার বদ্বীপবত্ সমতলভূমির সঙ্গে মিলে যায়, যেটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পৃথিবীর বুকে নাম লিখায় ১৯৭১ সালে। ১ লাখ ৪৪ হাজার বর্গ কিলোমিটারের অতিঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশ আজ তার ১৬ কোটি লোকের পর্যাপ্ত খাদ্য উত্পাদন করে। তৈরি পোশাক শিল্পে বাংলাদেশের সাফল্য আর নতুন করে বলার প্রয়োজন পড়ে না, তবুও বলা-  এ দেশটি এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারী। মোট জিডিপির পঞ্চাশ শতাংশেরও বেশি সেবাখাত থেকে উত্পাদিত হলেও প্রায় অর্ধেক বাংলাদেশি কৃষি খাতের সঙ্গে এখন পর্যন্ত জড়িত; সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্য হচ্ছে ধান।
দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই, নারীর ক্ষমতায়ন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য বাংলাদেশ এখন রোল মডেল।  খাদ্য ও শিক্ষা ক্ষেত্রে সহশ্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যাবলীর (এমডিজি) অধিকাংশই পূরণ করেছে দেশটি। গড় আয়ু এখন ৭১ বছর, যা কিনা প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে অন্তত ৫ বছর বেশি। ঘনঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও উচ্চ জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও তারা খাদ্য উত্পাদনে অবিস্মরণীয় সাফল্য দেখিয়েছে। ১৯৭২ থেকে ২০১৬, এ সময়ে খাদ্য উত্পাদন বেড়েছে তিন গুণ (১০ মিলিয়ন থেকে ৩.৫ মিলিয়ন টন)। ১৯৯৫ সাল থেকে উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধির হার গড়ে ২.৭ শতাংশ। গত ৪০ বছরে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে এমন কৃতিত্ব খুব কম দেশেরই রয়েছে। ধান উত্পাদনে বাংলাদেশ এখন পৃথিবীর চতুর্থ-বৃহত্ রাষ্ট্র। প্রযুক্তি, গ্রামীণ অবকাঠামো ও প্রযুক্তিতে বলিষ্ঠ সরকারি বিনিয়োগ সমর্থিত দৃঢ় নীতি কাঠামোর সুযোগটা ভালোই কাজে লাগিয়েছে বাংলাদেশের কৃষি খাত। ১৯৭০ দশকে ছিল পুরোপুরিই কৃষিভিত্তিক, সেখানে বাংলাদেশে এখন রপ্তানি-ভিত্তিক শিল্পায়নের কেবলই বিস্তার ঘটছে। উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর জন্য প্রবৃদ্ধি, প্রগতি ও উন্নয়নের নজির হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত দশ বছরের গড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশেরও বেশি। অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও দক্ষিণ এশিয়ায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগের গর্বিত স্থান এখন বাংলাদেশ। ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব নীতির পাশাপাশি রপ্তানি বাণিজ্যে দৃঢ় প্রবৃদ্ধি, কঠোর পরিশ্রমী শ্রমশক্তি ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিনিয়োগকারীরা দেশের অর্থনীতিকে ক্রমান্বয়েই আরো শক্তিশালী করে তুলছে।
শান্তির প্রতি দ্ব্যর্থহীন সমর্থন, সমপ্রীতি পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অধিকন্তু আঞ্চলিক বাণিজ্যে দৃঢ় নীতি দেশকে একটা ভালো অর্থনৈতিক অবস্থানে পৌঁছে দিতে সাহায্য করেছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরের নানা সমস্যা সত্ত্বেও এবং অনেক ভবিষ্যদ্বাণীকে ভুল প্রমাণ করে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করে ৭.১ শতাংশ। পোশাক রপ্তানি এখন বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশেরও বেশি হিস্যা হচ্ছে তৈরি পোশাক খাতের। গত বছর ৩৪.২৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছিল আর এতে তৈরি পোশাক খাতের অবদান ২৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য খাত হচ্ছে ওষুধপত্র, চামড়াজাত পণ্য, সিরামিক্স, ইলেকট্রনিক্স এবং হালকা ও মাঝারি শিল্প। বৈশ্বিক আইটি আউটসোর্সিংয়ের জন্য বাংলাদেশ এখন একটি বড় স্থান। সমুদ্রগামী জাহাজ নির্মাণেও খ্যাতি অর্জন করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে বাইসাইকেল রপ্তানির ক্ষেত্রে শীর্ষ কয়েকটি দেশের একটি হচ্ছে তারা। সেখানে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা  ১৩ কোটি আর  ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত ৬ কোটি লোক।
দৃঢ় রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এবং বিশ্বব্যাপী বসবাসরত ১ কোটি বাংলাদেশি কর্তৃক বাড়ন্ত রেমিটেন্স প্রবাহই (যার পরিমাণ ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) মূলত রাষ্ট্রটির অর্থনীতির চালিকাশক্তি। সামপ্রতিক মাসগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকেছে ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা খুবই সন্তোষজনক। বিশ্ব ব্যাংক আইএমএফ-এর তথ্যানুসারে, বাংলাদেশের জিডিপি (বর্তমান মূল্যভিত্তিক) ২২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ বিচারে বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৪তম। বিশ্বব্যাংক আরো জানিয়েছে, ২০১১ সালে ক্ষুদ্র এ দেশের জিডিপি বেড়ে দাঁড়াবে ৩২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এসবের প্রেক্ষিতে গোল্ডম্যান সাক্স বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আখ্যা দিয়েছে ‘মিরাকল অব দ্য ইস্ট’।
 বাংলাদেশে ক্রমান্বয়ে গঠিত হচ্ছে একটি শক্তিশালী মধ্যবিত্ত শ্রেণি, বিভিন্ন হিসেবে দেখা গেছে বর্তমানে এরা মোট জনসংখ্যার ১৮ শতাংশ। প্রায় ৩ কোটি লোকের উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং আমজনতার একটা বড় অংশের তুলনামূলকভাবে ভালো আয়ের স্তরের পাশাপাশি বাড়ছে অভ্যন্তরীণ চাহিদা- এগুলোই বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালকে পরিণত হয়েছে। বর্তমান সরকারের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হচ্ছে, দেশকে জ্ঞানভিত্তিক মধ্যম আয়ের অর্থনীতিতে পরিণত করা। ২০২১ সালে মাথাপিছু আয় দাঁড় করাতে চায় ২০০০ মার্কিন ডলার, যেটি এখন ১,৪৬৬ মার্কিন ডলার। লক্ষ্য স্থির করেছে, ২০৪১ সাল নাগাদ বাংলাদেশ হবে এক উন্নত রাষ্ট্র।
সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক
Facebook Comments