বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২০, ০১:৫৪ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
ভয়াবহ বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল লেবানন, নিহত ৫০, জাতীয় শোক ঘোষণা ( ভিডিও) ভয়াবহ বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল নেবানন, নিহত ৫০, জাতীয় শোক ঘোষণা ( ভিডিও) ভৈরবে কোরবানির মাংস বণ্টনকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের হামলায় একজন নিহত অক্টোবর থেকে নিজেদের তৈরি ভ্যাকসিন গণহারে প্রয়োগের পরিকল্পনা করছে রাশিয়া বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দেশের জনগণ সব সম্ভাবনা হারিয়ে ফেলে : প্রধানমন্ত্রী নবীগঞ্জে ব্যবসায়ী ইকবালকে অশ্রুসিক্ত ভালবাসায় শেষ বিদায়, এমপি মিলাদ গাজীর শোক আজ থেকে শুরু হচ্ছে ঈদের ছুটি নবীগঞ্জবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন যুক্তরাজ্য বিএনপি সদস্য মতিউর রহমান চৌধুরী হবিগঞ্জ বাংলাদেশ বাউল ফোরাম ইউকে’র কার্যালয় উদ্বোধন ও শিল্পীদের মধ্যে ঈদ উপহার বিতরণ প্রবাসের ঈদ : হেনা বেগম
প্রবন্ধঃ ডেল্টা এবং ক্র্যাক; KNOW YOUR RIGHT’S.

প্রবন্ধঃ ডেল্টা এবং ক্র্যাক; KNOW YOUR RIGHT’S.

বাংলাদেশ এমন একটি দেশ যেখানে সমস্যা এবং ভোগান্তির কোনো শেষ নেই। প্রতিটি সেক্টরের রন্দ্রে রন্দ্রে সমস্যা বিদ্যমান। আইন, প্রশাসন, চিকিৎসা, শিক্ষা, অর্থনীতি, চাকুরি, সমাজ সহ সকল ক্ষেত্রেই শুধু সমস্যা আর সমস্যা। ক্ষমতাহীনরা সবসময় ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতার অপ-ব্যবহারের শিকার হচ্ছেন। বাংলাদেশের সংবিধান কাগজ-কলমে নাগরিক’কে সুরক্ষা প্রদান করলেও বাস্তবচিত্র একদম ভিন্ন। গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার মৌলিক নীতি অনুসারে যেখানে জনগন সকল ক্ষমতার উৎস হওয়ার কথা সেখানে দেখা যায় ক্ষমতাসীন’রাই সকল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। এটি কেন ঘটছে?
পাকিস্তান শাসনামলে পূর্ব-পাকিস্থানে নিযুক্ত পাবলিক সার্ভেন্টরা নিজেদেরকে জনগণের প্রভু ভাবতেন। তারা পূর্ব-পাকিস্তানে নাগরিক সেবা প্রদান করতে নয় বরং প্রভুত্ব ফলাতে আসতেন। তারা এদেশে আসতেন সরকারী গাড়ি নিয়ে, থাকতেন সরকারী বাংলোয়, মাঝেমধ্যে জনপদের দিকে যেতেন পিকনিক করতে। জনগন কী চায়, তাদের কী সমস্যা সেগুলো শুনতে একদম পছন্দ করতেন না উনারা। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটা এরকম ছিল, ‘আমি পাকিস্তান সাম্রাজ্যর সরকারী লোক (পড়ুন লর্ড), সুতরাং আমি যে সমাধান (পড়ুন আদেশ) দিব তাই এদেরকে মেনে নিতে হবে। আমার কর্ম এলাকায় (পড়ুন জমিদারিত্বে) কোনোপ্রকার হাঙ্গামা চলবে না’। মূলত এরকম আরও অনেক বৈষম্যের কারনেই বাঙালীরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিল। তারা চেয়েছিল একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, এজন্যই আজ আমরা বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক। কিন্তু অবস্থার পরিবর্তন আদতে কতটুকু হয়েছে?
আচ্ছা চলুন, কয়েকটি ছোট গল্প বলি আপনাদের। ‘ক’ কিংবা ‘খ’ নামক কাল্পনিক চরিত্র ব্যবহার না করে নিজেকেই গল্পের চরিত্রে বসিয়ে দিলাম।
(১) আমি আমার গ্রামের একটি ছেলেকে অন্যায়ভাবে একদিন মেরে বসলাম। ছেলেটির বাবা গ্রামের মোড়ল কিংবা ওয়ার্ডের ইউপি সদস্যকে বিচার দিলেন। বিচার বসার পরে ইউপি সদস্য আমাকে দেখেই সুর নরম করে ফেললেন, কারণ আমার পরিবার খুব প্রভাবশালী। ছেলেটি ন্যায্য বিচার তো পেল-ই না বরং পরিবারের সামনে আরও অপমানিত হল।
(২) একবার আমি পারিবারিক একটা সমস্যার কারনে থানায় গেলাম। ওসি সাহেবের সাথে দেখা করা আমার প্রয়োজন ছিল। আমি উনার অফিসে ঢুকলে আমার দিকে একনজর তাকিয়ে কলিংবেল টিপে একজন অফিসারকে ডাকলেন, উনাকে ধমকা-ধমকি করলেন এই বলে যে, ‘যাকে তাকে অফিসে ঢুকতে দাও কেন?’ উনার ধমক খেয়ে অফিসার আমাকে টেনে বহিরে নিয়ে গেলেন। আমি অপমানিত হয়ে আমার পরিচিত একজন এসপি’কে ফোন দিয়ে থানার ঘটনা সব বলতেই উনি আমাকে অপেক্ষা করতে বললেন। ২ মিনিটের মাথায় আমাকে আবার ওসি সাহেবের অফিসে নিয়ে যাওয়া হল। আমাকে চেয়ারে বসিয়ে স্যরি বলা হলো, চা খাওয়ানো হলো। আগে থেকেই দু’জন সেবা গ্রহীতা বসে ছিলেন, তাদেরকে পাশ কাটিয়ে আমার সমস্যার সমাধান দেওয়া হলো।
(৩) একবার একটা হাসপাতালে আমার এক আত্মীয়কে দেখতে গেলাম। ওয়ার্ডে গিয়ে দেখি উনাকে ফ্লোরে বিছানা পেতে শুইয়ে রাখা হয়েছে। উনাকে জিজ্ঞেস করে জানলাম, দালাল সিন্ডিকেটের দাবিকৃত অর্থ সরবরাহ করতে না পারায় সিট পান নি তিনি। আমি ওয়ার্ডের ইনচার্জ এর কাছে গিয়ে এর ব্যাখ্যা চাইলাম। উনি মুখস্ত উত্তর দিলেন, ‘সিট খালি নেই’। আমি তাকে অনেকগুলো খালি সিট দেখালে উনি আমার দিকে অগ্নিদৃষ্টি হেনে তাকে বিরক্ত না করতে বললেন। আমি তাকে বিরক্ত না করে একজন মানুষকে কল করলাম। উনাকে বিস্তারিত বলে ইনচার্জ এর কানে ফোন ধরিয়ে দিলাম। সেই ক্ষমতাবান মানুষটি নিশ্চয়ই কোন জাদুমন্ত্র উচ্চারণ করেছিলেন ফোনে। কথা বলা শেষ হবার ৩০ সেকেন্ডের মাথায় দৈব ক্ষমতাবলে একটি সিট খালি হয়ে গেল।
(৪) শিক্ষাবোর্ড থেকে কিছু ডকুমেন্ট উত্তোলন করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে গেলেই উনি বলেন সামনের সপ্তাহে আসেন। অনেক পুরনো ফাইল, তাই খুঁজে পেতে দেরি হচ্ছে। এভাবে বেশ কয়েকসপ্তাহ ঘুরার পরে মাথায় বুদ্ধি আসলো। একজন উচ্চপদস্থ সরকারী আমলা’র রেফারেন্স সহকারে দেখা করলাম শিক্ষাবোর্ডের কর্মকর্তার সাথে। ওমা, একি! আমাকে দেওয়া কফি শেষ করার আগেই ডকুমেন্টগুলো পেয়ে গেলেন উনি। আমিও উনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে আমার ফাইল নিয়ে চলে আসলাম।
(৫) এবারে বলি আমার পরিচিত এক বড় ভাইয়ের কথা। ইন্টারভিউ দিতে দিতে চাকরি হচ্ছে না কোথাও, উনি খুব হতাশ। অনেক খুঁজে উনি বের করলেন আলাদীনের দৈত্য’কে। আলাদিনের দৈত্য কিছু উপহারের বিনিময়ে বড় ভাইকে দিলো একটা জাদুর চিরকুট। পরেরবার ইন্টারভিউ বোর্ডে গিয়ে প্রশ্নকর্তাকে জাদুর চিরকুট’টি দিলেই উনি পেয়ে যাবেন পরম সাধনার ধন ‘সোনার হরিণ’। আলাদীনের দৈত্যের কথা কখনো বিফলে যায় না কিন্তু!

গল্পগুলো কেমন লাগলো? নিশ্চিত খুব ভালো লেগেছে! আচ্ছা, এক কাজ করলে কেমন হয়? উপরের পাঁচটি গল্পের ‘আমি’ নামক চরিত্রের জায়গায় নিজেকে বসিয়ে দৃশ্যপট কল্পনা করুন – আমার মত কি আপনারও এমন সুন্দর সুন্দর জাদুমন্ত্র বলা পরিচিত মানুষ আছেন? উত্তর যদি ‘হ্যা’ হয় তাহলে আপনি পড়া থামিয়ে দিন। এসব ছাই মার্কা লেখা পড়ে কোন লাভ নেই আপনার। শুধু শুধু সময়ের অপচয় করবেন কেন? সময় খুব মূল্যবান, কাজে লাগান। আর আপনার উত্তর যদি ‘না’ হয় তাহলে পড়তে থাকুন।
আমি হলফ করে বলতে পারি ‘না’ উত্তর দেওয়া লোকের সংখ্যা কমপক্ষে ৮০ ভাগ। মানে বাংলাদেশের শতকরা ৮০ জন কিংবা তার চেয়েও বেশি লোক ক্ষমতাহীনদের কাতারে পড়েন। এবং বাজি ধরে বলা যায় এই ৮০% জনসংখ্যা বিভিন্নভাবে প্রতিনিয়ত তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ধরে নিলাম এই ৮০% এর মধ্যে ১০% নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন এবং তার অর্ধেক সৎভাবে নিজের অধিকার আদায় করছেন কিন্তু সেই অধিকার আদায় করতে তাদেরকে প্রচুর যন্ত্রণা পোহাতে হচ্ছে। বাকি অর্ধেককে আলাদিনের চেরাগ, মানে অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করতে হচ্ছে।
একটু অংক কষি? ছোট্ট অংক। বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটি। [২০০০০০০০০/১০০*৮০=১৬০০০০০০০(ষোল কোটি)] তাহলে প্রায় ষোল কোটি মানুষ তাদের ন্যায্য অধিকার সুষ্ঠভাবে পাওয়া থেকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত এবং বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন। ‘চার’ এর কারনে ‘ষোল’ বঞ্চিত হচ্ছে কেন?
আচ্ছা এবার একটু সাম্প্রতিক সময়ের দু’একটি ঘটনা দেখি,
(১) সিলেটের একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার করোনায় আক্রান্ত হয়ে ঢাকার একটি হাসপাতালে শিফট হওয়ার জন্য এয়ার এম্বুলেন্স চাইলে তাকে তা দেওয়া হয়নি। কারণ সেটা ভিআইপি সার্ভিস এর জন্য সংরক্ষিত ছিল।
(২) ভিআইপিদের করোনা’র চিকিৎসার জন্য আলাদা হাসপাতাল (বোধহয় ইউনিট, একটু অনিশ্চিত তথ্যটা নিয়ে) নির্মান করা হয়েছে। শুধুমাত্র “ভেরি ইম্পোরট্যান্ট পার্সন’রাই” ওখানে চিকিৎসার সুযোগ পাবেন। সাধারণ মানুষ তো দূরে থাক এমনকি কোনো ডাক্তার পর্যন্ত ওখানে সেবা পাবেন না।
(৩) হাইকোর্টের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা স্বত্তেও প্রসূতি একজন মা’কে হাসপাতাল থেকে করোনা আক্রান্ত সন্দেহে ভর্তি না করে’ই ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এরকম একটি ঘটনার শিকার হয়ে খুব সম্প্রতি একজন মৃত্যুবরণ করেছেন। চিন্তা করুন একটি মানবশিশু জন্মলাভের আগেই বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতার অপব্যবহারের শিকার হয়ে তার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হল।
সরকারের ভাষ্যমতে সুনির্দিষ্ট কিছু পদবীধারী ভিআইপি হিসেবে গণ্য হবেন। কিন্তু আসল চিত্র ভিন্ন। অসংখ্য ক্ষমতাধারী মানুষ তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনৈতিকভাবে এই সুবিধা ভোগ করছেন। কেন হচ্ছে এসব অন্যায়?
‘আমি’ নামক চরিত্র কেন অন্যায় করেও সামাজিক প্রভাবের কারণে পার পেয়ে যাচ্ছে?
পাবলিক কেন তার সার্ভেন্ট’কে ‘স্যার’ বলে ডাকতে বাধ্য হচ্ছে?
সাংবিধানিকভাবে সুনিশ্চিতকৃত ন্যায্য অধিকার থেকে কেন জনগন বঞ্চিত হচ্ছে?
একজন নাগরিক কেন তার মৌলিক অধিকার পেতে বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছে?
যোগ্যতা থাকা স্বত্ত্বেও কেন একজন শিক্ষিত মানুষকে চাকরি পাওয়ার জন্য ঘুষ এবং সুপারিশ পন্থা অবলম্বন করতে হচ্ছে?
কেন একজন পাবলিক সার্ভেন্ট/রিপ্রেজেন্টিটিভ অনৈতিকভাবে অতিরিক্ত সুবিধা গ্রহণ করছে?
সর্বোপরি, সেবক’রা কেন সেবা প্রদানের পরিবর্তে নিজেদেরকে প্রভুতুল্য হিসেবে জাহির করছে?
উত্তরটা আমরা জানি। এটা হল দুর্নীতি নামক অভিশাপ। কিন্তু আসলেই কি কেবলমাত্র দুর্নীতি’ই দায়ী এসবের জন্য? আমি একটু ভেতরে ঢুকি আপনাদের নিয়ে। আসলে দুর্নীতির থেকেও বেশি দায়ী হলো ‘অসচেতনতা’। বুঝিয়ে বলছি, একটু ধৈর্য্য ধরুন।
মনে করি, “বিশাল শক্তিশালী একটি সেনাবাহিনী’র নাম হলো ‘ডেল্টা’। তাদের কাছে সব ধরণের আধুনিক অস্ত্র আছে। যেকোন শত্রুর বিরুদ্ধে তারা অজেয়। দূর্ভাগ্যক্রমে, একবার শত্রুপক্ষের একটি এয়ারফোর্স ‘ক্র্যাক’ এর আক্রমনে তারা পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে। সেই থেকে তাদের ধারণা জন্মে যায় যে তারা কখনোই ‘ক্র্যাক’ এর সাথে পেরে উঠবে না। সেই থেকে শুরু, তারা যুদ্ধে কেবল হারতেই লাগলো। একটা পর্যায়ে তারা যুদ্ধ করতেই ভয় পাওয়া শুরু করল। অথচ তাদের কাছে এমন অস্ত্র আছে যা দিয়ে মুহুর্তের মধ্যে ‘ক্র্যাক’ বাহিনীকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারবে। কিন্তু সমস্যাটি হল তারা তাদের শক্তি সম্পর্কে সচেতন ছিল না, একদমই না। ‘ডেল্টা’র এই অসচেতনতা কিংবা অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে ‘ক্র্যাক’ বাহিনী ক্রমেই তাদের উপর চড়ে বসল, নিজেদেরকে একসময় ডেল্টা’র প্রভু ভাবতে শুরু করল ক্র্যাক।”
এখন, আমরা যদি ন্যায্য অধিকার থেকে বিভিন্নভাবে বঞ্চিত ষোল কোটি সাধারণ নাগরিকদের অর্থাৎ আমাদেরকে ‘ডেল্টা’র সাথে তুলনা করি এবং ‘ক্র্যাক’ কে দুর্নীতিগ্রস্থ হয়ে অন্যায়ভাবে আমাদের উপর ছড়ি ঘোরানো স্ব-স্বীকৃত প্রভুদের সাথে মিলাই তাহলে কিন্তু বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। ‘ডেল্টা’ কিংবা আমরা যদি নিজেদের শক্তি অর্থাৎ ‘অধিকার সম্পর্কে সচেতন’ হই তাহলেই কিন্তু এসব সমস্যার সমাধান আপনাতেই হয়ে যাচ্ছে। আপনি তখন’ই নিজের ন্যায্য অধিকার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে পারবেন যখন আপনি অধিকার সম্পর্কে জানবেন। নিজেদের অধিকার সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ সচেতন এবং আদায় করতে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করা ষোল কোটির বিরুদ্ধে মাত্র চার কোটি কিংবা তারচেয়েও অনেক কম সংখ্যক অসাধু কীভাবে খুব বেশিদিন প্রভুত্ব ফলাতে পারবে?
যেকোনো সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে হলে কিছু নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে কাজ করতে হয়। প্রথমত সমস্যাটি বুঝতে হবে, সেটা সম্পর্কে জানতে হবে এবং তারপরে সমাধানের উপায় বের করে সেটা প্রয়োগ করতে হবে। বাংলাদেশ সরকার দূর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে। এটা খুব’ই আনন্দের বিষয়। তবে আমার মনে হয়, নীতি নির্ধারক’রা এই যুদ্ধের মূল অস্ত্রটির বিষয়ে এখনো অজ্ঞাত রয়ে গেছেন। দেশের প্রতিটি মানুষকে যদি তাদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে না পারেন তাহলে এই যুদ্ধে জয়লাভ করা প্রায় আকাশকুশুম কল্পনা’র মতোই।
যুদ্ধে জয়লাভ করতে হলে আপনাকে প্রথমে জানতে হবে আপনি কিসের জন্য যুদ্ধ করছেন। যেহেতু এই যুদ্ধ দূর্নীতির বিরুদ্ধে তাই প্রথমে খুজতে হবে দূর্নীতি কীভাবে সংগঠিত হয়। আমরা এর উত্তর জানি, দূর্নীতিবাজরা জনগণের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে অজ্ঞতা কিংবা অসচেতনতাকে পুঁজি করে অপরাধ করে। যেহেতু একদম মুলে রয়েছে রাষ্ট্রপ্রদত্ত অধিকার সম্পর্কে অজ্ঞতা তাই এই যুদ্ধের সর্বপ্রথম ধাপ হল প্রত্যেক জনগণকে তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলা। সচেতন হলেই কেবল অধিকার আদায় করার যুদ্ধ শুরু করা যাবে। আর ন্যায্যভাবে অধিকার আদায় হওয়া মানেই দূর্নীতির চিরবিদায়।
সচেতন কীভাবে করবেন? সচেতনতা প্রচারের বিভিন্ন উপায় রয়েছে। তবে একটা কথা মনে রাখা উচিৎ ‘চারাগাছের যত্ন নিলে তা আপনাতেই শক্তিশালী এবং ফলবান বৃক্কে রূপান্তরিত হবে’। জাপান সহ উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিশুদেরকে তার স্কুল জীবনের প্রথম কয়েকবছর সামাজিক আচরণবিধি, আইন, সৌজন্যতা, যোগাযোগ এবং অধিকারবোধ সম্পর্কে শিক্ষা প্রদান করা হয় সর্বাধিক যত্ন ও গুরুত্বসহকারে। আমাদেরও উচিৎ আমাদের শিশুদেরকে নিজেদের শক্তি সম্পর্কে সচেতন সেনাবাহিনী ‘ডেল্টা’র মত করে গড়ে তোলা এবং তাদেরকে তাদের সুপ্ত শক্তি সম্পর্কে সচেতন করে দেওয়া। কেবল তবেই আমাদের শিশুরা অনৈতিকভাবে নিজেদের প্রভু হিসেবে জাহির করা দুর্নীতিপরায়ণ ‘ক্র্যাক’ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ করতে পারবে।
যুদ্ধের জন্য তৈরী হতে আমাদের দেরী হয়ে গিয়েছে, এর ফলস্বরুপ সমাজ এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি সেক্টরে দূর্নীতির শক্ত শেকড় গজিয়ে উঠেছে। তবে, খুব দেরী যাতে না হয়ে যায় সেজন্য আমাদেরকে এখন’ই প্রস্তুতি শুরু করে দিতে হবে। জানেন’ই তো যুদ্ধকালীন সময়ে প্রতিটি সেকেন্ডের মুল্য অকল্পনীয় পরিমাণে দামি। চলুন প্রথমে নিজেকে দিয়ে’ই শুরু করি। ন্যায্য অধিকার সম্পর্কে প্রথমে নিজেই সচেতন হই, যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিজে থেকেই শুরু করে দেই।
আমি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারব, আমার পারিবারিক এবং সামাজিক ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে আজ পর্যন্ত কোন সুবিধা ভোগ করিনি, করবও না। জীবনে এক পয়সাও ঘুষ দেইনি, দিবও না। প্রয়োজনে নিজের অবস্থান থেকে ফাইট করব, হয়ত হারব কিংবা জিতব কিন্তু অন্যায়ভাবে কোন কোনকিছু হাসিল করব না। একটা উদাহরণ দেই, ‘দু’বছর পূর্বে আম্মুকে নিয়ে একটি সরকারী হাসপাতালে যাই। যথারীতি দূর্নীতিবাজদের খপ্পড়ে পড়ি, পুরো একটা সিন্ডিকেটের সাথে প্রায় সারাদিন একা লড়াই করে আমার কাজ উদ্ধার করি। অথচ ওই হাসপাতালের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা আমার পরিচিত ছিলেন, এক মুহুর্তের জন্যেও তার কাছে যাই নি আমি বিশেষ সুবিধা পাওয়ার আশায়’।
আমার সোজা কথা, আমার অধিকার আমি নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে বুঝে নিব, কোন অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করব না। হয়তোবা এই জেদ কিংবা সৎসাহসের কারনে জীবনে অনেক কষ্ট করতে হবে কিন্তু আমার সন্তানের কাছে তো নিজেকে একজন সৎ বাবা হিসেবে পরিচয় দিতে পারব। সবচেয়ে বড় কথা, নিজের বিবেকের কাছে নিজেকে সৎ রাখতে পারব। এর চাইতে বড় কোন প্রাপ্তি মানুষের আছে বলে আমার মনে হয় না। আপনি চাননা নিজের কাছে সৎ থেকে মৃত্যুবরণ করতে?

পরিশেষে, দুর্নীতিবাজরা দুর্নীতি করে কারণ এর চাহিদা এবং সুযোগ রয়েছে প্রচুর। ঘুষখোর ঘুষ খায় কারণ আমরা’ই তাদেরকে ঘুষ প্রদান করি। সবকিছুর মুলেই ‘আদান-প্রদান’ ব্যবস্থা রয়েছে। আসুন আমরা আমাদের নিজের অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করে ‘প্রদান’ বন্ধ করি, তারাও দুর্নীতি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবে। সোনা যতোই মূল্যবান হোক না কেন, পৃথিবীর সব মানুষ যদি সোনা’কে বয়কট করে তাহলে কিন্তু সোনা যা পিতল ও তা। And Obviously You Should Know Your Right’s.

লেখকঃ ফাহাদ আহমেদ।
বিবিএ তৃতীয় বর্ষ
ফেন্সুগঞ্জ সরকারী কলেজ
২৮.০৬.২০২০/সিলেট

 

 

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




themesba-zoom1715152249
© ২০১৭ - সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত - সিলনিউজ২৪.কম
ডিজাইন ও ডেভেলপে Host R Web