শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০, ০৮:১৪ অপরাহ্ন

নিম্নবিত্তের কান্না : মোস্তাক আহমেদ

নিম্নবিত্তের কান্না : মোস্তাক আহমেদ

 
আমি রোজ রিকশা করে অফিসে যাওয়া-আসা করি। কোভিডের কারণে যেহেতু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, আমার কলেজ শিক্ষিকা স্ত্রী ও স্কুল পড়ুয়া ছেলেমেয়েকে সঙ্গত কারণে বাসায়ই অবস্থান করতে হয়, সেহেতু আমার একার জন্য গাড়ির ড্রাইভার রাখাকে নিতান্ত বিলাসিতা মনে করে কভিড সংক্রমণ এড়িয়ে চলতে গণপরিবহন বাদ দিয়ে রিকশার মতো সহজলভ্য যানকেই আমার প্রতিদিনকার বাহন হিসেবে বেছে নিয়েছি। আমার বাসা থেকে অফিসের দূরত্ব সামান্যই।
 
আমার ভালোই লাগে। দমবন্ধ ঢাকা শহরের মুক্ত বায়ুর সাথে, রাস্তার দু’ধারের প্রকৃতির সাথে রোজ দু’বার অন্তত সাক্ষাতের সুযোগ হয়। আমি মনে মনে একে রথ দেখা ও কলা বেচার সাথে তুলনা করি। গাড়িঘোড়া বাদ দিয়ে ঢাকার লোকজন যদি এমনটা করতো তাহলে প্রকৃতি ও পরিবেশের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যেরও যথেষ্ট উন্নতি ঘটতো।
 
কিন্তু এ-তো বললাম আমাদের মতো মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগীর কথা। পেটে খাবার থাকলে মনের ভেতর কত আবেগ অনুভূতিরই না পয়দা হয়- নদী ভাল লাগে, হাওড় বাওড়, পাখির কিচিরমিচির, ঝর্ণা, অরণ্য প্রকৃতি সবই মনোহর লাগে। কিন্তু হাওড় জনপদের মানুষকে জিজ্ঞেস কর, হাওড়ের রূপ কি? পাহাড়ের অধিবাসীদের জিজ্ঞেস কর, তাদের জীবনযাত্রা কীরূপ? অরণ্যের লোকদের জিজ্ঞেস কর, তারা কীভাবে বেঁচে আছে? যে পল্লী-প্রকৃতির রূপ দেখে তোমার কবি মনে ভাব আসে, তাদের জিজ্ঞেস কর প্রতিদিনকার জীবনযাপন? উত্তর যা পাবে তাতে মন বিষন্ন হবে বৈকি!
 
আজ একই বিষন্নতা আমাকে পেয়ে বসে। বাসা থেকে বের হয়েই প্রতিদিনকার মতো অনেকগুলো রিকশা গেইটের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। আমি সচরাচর মধ্যম বয়সের চালককেই পছন্দ করি। কারণ, ওদের গায়ে শক্তি আছে, কম সময়ে আমাকে গন্তব্যে পৌঁছিয়ে দেয়। রিকশাওয়ালাদের দিকে ভাসাভাসা দৃষ্টি দিয়ে এক যুবক রিকশাওয়ালাকে বললাম, ‘মতিঝিল যাবে? কত নেবে?’ বললো, ‘চলেন, আশি টাকা।’ আমি সচরাচর আশি /একশোর মধ্যেই যাই। তাই কোন কথা না বলে রিকশার সামনে দিয়ে ঘুরে উঠতে যাবো। রিকশাওয়ালা বললো, ‘কতোই যাবেন?’ উত্তর দেওয়ার আগেই আমি রিকশায় উঠে গেলাম। রিকশাওয়ালা হয়তো ভেবেছিল এ ভাড়ায় আমি যাবনা, তাই অন্য রিকশা তালাসে যাচ্ছি। কিন্তু তার রিকশায় উঠার পর মনের ভেতর জমানো খেদ উদগীরণ করে বললো, ‘আপনি বিশ টাকা দিলেও আমি যেতাম।’ বললাম, ‘কেন?’ বললো, ‘সকাল ছয়টায় বেরিয়েছি, এপর্যন্ত কেবল তিরিশ টাকার একটি খেপ পেয়েছি।’ আমি তার বাড়ি জিজ্ঞেস করলাম। সে যে জেলার নাম বললো সেখানে আমি অনেকদিন চাকরি করেছি। ফলে একথা সেকথা নানান কথা তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম। দেখি, আমি ওর গ্রাম পর্যন্ত চিনি।
বয়স আর কত হবে? বড়জোর তিরিশ বত্রিশ। বললো, কামাই রুজি মোটেই হচ্ছেনা। আগে স্কুল কলেজ খোলা ছিল। অনেক খেপ দিতে পারতাম। করোনার কারণে সব বন্ধ। তাই কামাই রুজিও বন্ধ। মধ্যবিত্তরা আধ মরে গেছে, আর আমরা গরীবেরা এখন বিষ খেলেই বাঁচি।
কথাটা আমার আঁতে লাগলো। আজই এক খবরে দেখলাম, বেকার হয়ে কয়েক লাখ লোক গ্রামে ফিরে গেছে। গ্রামে গিয়ে করবেটা কি? কভিডের কারণে অনেক কর্মক্ষম লোকই আজ বেকার হয়ে পড়েছে। আমি যে এপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ে থাকি তাদের অধিকাংশই তাদের গাড়ির ড্রাইভার ছেড়ে দিয়েছে। বেতন কমে যাওয়ায় অনেকেই ফ্ল্যাট ছেড়ে দিয়ে পরিবার গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে নিজে মেসে উঠেছে। অনেকে তাদের কাজের লোকদেরও বিদায় করে দিয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাই শুরু করেছে। নতুন করে নিয়োগ দিচ্ছেনা। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কয়েকমাস পরে চালু হলেও তা ঢিমে তেতাল অবস্থা। সেখানেও স্থায়ী ও খণ্ডকালীন কর্মচারী অনেক কমে গেছে। তারাই বা করবে কি? উৎপাদন কম হলে, কারখানা বা ব্যবসায়ে চাহিদা কম হলে কর্তৃপক্ষ অধিক জনবল দিয়ে করবে কি? তারা তো আয় থেকে ব্যয় নির্বাহ করবে- এটাই স্বাভাবিক।
 
রিকশাওয়ালার কথা শুনে আমার চোখে ধূসর দৃষ্টি। পথে প্রান্তরে আমরা যাদের সাধারণ বলি, তারা কত করে আমাদের চোখ খুলে দেয়! আমরা উন্নয়নের লক্ষ্যে, দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে, কত উপলক্ষে কত রকমের গবেষণা ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে থাকি। কিন্তু সেইসব কর্মপরিকল্পনা-ই ফলদায়ক যার সাথে বাস্তব পরিস্থিতির মিল থাকে। কভিড পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়া এখন আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
 
 
মোস্তাক আহমেদ
উপ-সচিব, শিল্প মন্ত্রণালয়

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




themesba-zoom1715152249
© ২০১৭ - সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত - সিলনিউজ২৪.কম
ডিজাইন ও ডেভেলপে Host R Web